কুষ্টিয়ার গোল্ড ব্যবসায়ী ভয়ঙ্কর প্রতারক শিক্ষক মহাদেব পালের সন্ধান লাভ

কে এম শাহীন রেজা কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি।।
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ জুন, ২০২১
  • ৪৬৫ বার পঠিত



কুষ্টিয়ার গোল্ড ব্যবসায়ী ও ভয়ঙ্কর প্রতারক শিক্ষক মহাদেব পালের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। তিনি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার আলামপুর বালিয়াপাড়া স্কুল এন্ড কলেজের স্কুল শাখার ব্যবসায় শিক্ষা শাখার একজন শিক্ষক। উক্ত প্রতিষ্ঠানে ২০১২ সালে যোগদান করার পর থেকেই শিক্ষকতার অন্তরালে গোল্ড ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। উক্ত এলাকায় তাকে গোল্ড মাফিয়া মহাদেব নামে সকলেই চেনে। তার বাড়ি কুষ্টিয়া ইবি থানার ধলনগর গ্রামে।


কুষ্টিয়ার একটি গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে শিক্ষকতা পেশার অন্তরালে দীর্ঘদিন ধরে মহাদেব পাল সোনা পাচারের কাজে লিপ্ত থেকে উপার্জন করেছিল প্রচুর পরিমাণ অর্থ। গত চার-পাঁচ বছর আগে গোল্ডের বেশ কয়েকটি চালান ধরা পড়লেও তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। গোল্ডের চালান ধরা পড়ার কারণে হঠাৎ করেই তার বিপুল পরিমাণ অর্থের ঘাটতি দেখা দেয়।


অর্থ ঘাটতি পূরণের জন্য তিনি বেছে নেন নতুন কৌশল। একের পর এক তার নিজ গ্রাম ধলনগরের আপন চাচি শাশুড়ির মেয়ের চাকরি দেয়ার নাম করে ভিটে মাটি বিক্রি করে অর্থ বাগিয়ে নেয়, সেই সাথে কেড়ে নেয় ১০ ভরি স্বর্ণের গহনা। এদিকে বালিয়াপাড়া গ্রামের রিপন, সৈন্য, সাব্বাস, নিজাম মন্ডল, মজিবর সহ প্রায় ২০/২৫ জন ব্যক্তির সন্তানদের চাকরি দেয়ার নাম করে চেক দিয়ে অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।


পোড়াদহের বিমলের কাছ থেকে চেক দিয়ে ১২ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়। চুয়াডাঙ্গা এলাকার আলিম লস্করের কাছ থেকে ১লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয় চেক দিয়ে। রাজবাড়ী এলাকার এক ব্যক্তি ইতিমধ্যে পাওনা টাকার জন্য চেকের বিপরীতে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে, উক্ত মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে মহামান্য আদালত।


কুষ্টিয়া শহরের এক মুদি দোকানদার লুৎফরের কাছ থেকে ২ লক্ষ টাকা, মঙ্গলবাড়িয়া এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হিন্দু ধর্মীয় গরীব নিরীহ ব্যক্তির নিকট থেকে এক লক্ষ টাকা, কুষ্টিয়া শহরের নাম প্রকাশে আর একজন ব্যক্তির নিকট থেকে ৫ লক্ষ টাকা সহ প্রায় শতাধিক ব্যক্তির নিকট থেকে চাকরি দেয়ার প্রলোভন দিয়ে চেক দিয়ে প্রায় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছে।


এমনকি কুষ্টিয়া পৌর মেয়র আনোয়ার আলীর স্বাক্ষর জালিয়াতি করে চাকরি দেওয়ার প্রাক্কালে তিনি ধরা খেলে অবশেষে হাতে-পায়ে ধরে সেযাত্রাও তিনি রক্ষা পায়। কুষ্টিয়া জেলা স্কুলের ছাত্র ভর্তির জন্য এনএস রোডের এক অভিভাবকের নিকট থেকে ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। বালিয়াপাড়া স্কুলে বিএসসি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এক ক্যান্ডিডেটের নিকট থেকে হাতিয়ে নিয়েছিল ৮ লক্ষ টাকা পরবর্তীতে উক্ত টাকা ফেরত দেয়া লেগেছে বলে প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে।


করোনাকালীন সময়ে স্কুলে চাওয়ার কারণে বর্তমানে তিনি এখন পলাতক রয়েছে, তবে পাওনাদাররা প্রতিবেদককে জানিয়েছেন যে, তিনি কুষ্টিয়া শহরের বজলার মোড় থেকে নিশান মোড়ের মধ্যবর্তী একটি বাসায় ভাড়া রয়েছেন। প্রতিদিন তিনি কাক ডাকা ভোরে বাসা থেকে বেরিয়ে যান এবং রাতের অন্ধকারে বাড়িতে ঢোকেন বলে জানিয়েছেন তারা। তবে তিনি পাওনাদারদের উৎপাতে প্রতি দুই মাস পর-পর বাসা পরিবর্তন করেন।


তারা আরো বলেন, আমরা টাকা চাইতে গেলে মহাদেব পাল আমাদেরকে আন্ডার ওয়ার্ল্ডের ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে, এছাড়াও তিনি ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের নাম ভাঙিয়েও ভয়-ভীতি প্রদর্শন করছেন প্রতিনিয়ত।
ইতিপূর্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্থ লুটপাট ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে চাকুরী হতে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল, পরবর্তীতে নেতাদের হাতে পায়ে ধরে আবার চাকুরী ফিরে পায়।


২০১৫ সালে পোড়াদহের বিমলের লোকজন মাইক্রো নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসেছিল তাকে তুলে নিয়ে যেতে, অর্থ আদায়ের জন্য। ওই সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা তাকে রক্ষা করেছিল। এছাড়াও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেয়েদের সঙ্গে ছিল তার অবাধ মেলামেশা এমনকি বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চেয়েছিল। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা তাকে থমকে দেয়, বন্ধ হয়ে যায় তার বিবাহ।


অন্যদিকে উক্ত প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষকের মুখ থেকে জানা গেছে, সে একজন ভয়ঙ্কর প্রতারক ও গোল্ড পাচারকারী। তার নামে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। আমরা তার সঙ্গে কোন কথাও বলি না যোগাযোগ করার চেষ্টাও করিনা তবে বিভিন্ন পাওনাদাররা প্রতিদিনই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার খোঁজে আসতে দেখি।



তার বিষয়ে উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ আবু বক্কর সিদ্দিক’র এর সাথে তার বিষয়ে সার্বিক কথা হলে তিনি বলেন, আমরা মহাদেব পালকে নিয়ে বিপদের মধ্যে আছি দীর্ঘ দশটি বছর ধরে। অত্র প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙিয়ে তিনি নানা ধরনের অপকর্ম করে আসছেন। ইতিমধ্যে তাকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল। অন্যদিকে পাওনাদারেরা টাকার জন্য হরহামেশা প্রতিষ্ঠানে আসছে।

 

এছাড়াও তার চাচি শাশুড়ি একদিন এসেছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাওনা টাকার জন্য, ওই সময় মহাদেবকে গালিগালাজ করে তিনি ফিরে যান। আমরা আর তাকে রক্ষা করতে পারছিনা আপনারা পারলে পাওনাদারদের স্বার্থে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তিনি আরো বলেন মহাদেব পাল তিনি যে এত ভয়ঙ্কর প্রতারক সেটি আমরা আগে জানতাম না। এখন তার বিষয়টি নিয়ে সবার মুখে মুখে রব উঠেছে সে একজন ভয়ঙ্কর প্রতারক ও গোল্ড মাফিয়া।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর

 

 

 

বগুড়ায় ট্রেন চালকের দক্ষতায় বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে দোলন চাঁপা আন্তঃনগর ট্রেন। ওই ঘটনায় দু’জন আহত হলেও কয়েক’শ মানুষ প্রাণে বেঁচে গেছেন। রেল লাইনের উপর অবৈধ দোকানগুলো ওই দুর্ঘটনার কারণ বলে জানিয়েছেন রেল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় লোকজন।

বগুড়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে মাত্র ত্রিশ গজ দূরেই এক যুগেরও বেশি সময় ধরে (বগুড়া রেলস্টেশন থেকে একনম্বর ঘুমটি পর্যন্ত ) প্রায় তিন শতাধিক অবৈধ কাপড়ের দোকান রেল লাইনের উপর রয়েছে। বগুড়ার পুরাতন কাপড়ের বড় মার্কেট এটি। পরিচিত ‘হঠাৎ মার্কেট’ হিসেবে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কয়েক হাজার ক্রেতার সমাগম ঘটে। বছরে একবার করে রেল থেকে ওইসব দোকান উচ্ছেদ করলেও দুই তিনদিন পরে আবারও দোকান আগের মতো বসে। মূল রেল লাইনের উপর তাঁবু টানিয়ে এসব দোকান বসানো হয়েছে। ট্রেন চলে আসলেই দ্রুত তাবুগুলো সরে ফেলা হয়। কয়েক বছরে প্রায় ৭-৮ জন ক্রেতা এবং বিক্রেতার প্রাণহানি ঘটেছে এই হঠাৎ মার্কেটে।

বগুড়ার রেলস্টেশনের স্টেশন মাষ্টার আবুল কাশেম জানান, দুপুর ১১টায় দোলন চাঁটা আন্তঃনগর ট্রেন বোনারপাড়া থেকে বগুড়ায় আসছিল। অপরদিকে আরেকটি আন্তঃনগর ট্রেন লালমনি এক্সপ্রেক্স ঢাকা থেকে বগুড়া স্টেশনে আসতে থাকে। সিগন্যাল এবং পয়েন্ট ঠিক করে দোলনচাঁপা ট্রেনটির জন্য দুইনম্বর লুপ লাইনে এবং লালমনি এক্সপ্রেক্সকে একনম্বর লাইনে আসার নির্দেশনা ঠিক করা হয়। দোলনচাঁপা ট্রেনটি হুইসেল দিতে দিতে দুই নম্বর লুপ লাইন দিয়ে স্টেশনে আসতে থাকে।

‘হঠাৎ মার্কেট’র দোকানদারদের জানা ছিল ওই ট্রেনটি একনম্বর লাইন দিয়ে আসবে। তাই তারা দোকানের তাবু সরাইনি। কিন্তু যখন ট্রেনটি দুইনম্বর লুপ লাইন দিয়ে হুইসেল দিতে দিতে আসতে থাকে তখন দোকানদার এবং ক্রেতারা চিৎকার করে এদিক ওদিক দৌড়ে পালাতে থাকে। ট্রেন চালক দ্রুততার সাথে ট্রেনটি ব্রেক করায় দোকানের মালামাল নষ্ট হলেও কোন প্রাণ হানি ঘটেনি। নইলে অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারতো।

তিনি আরও জানান, গত ১৯ নভেম্বর লালমনিহাট থেকে বিভাগীয় ভূ-সম্পদ কর্মকর্তাসহ উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা স্টেশনের পাশের একটি মার্কেটের প্রায় দুইশতাধিক অবৈধ স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়ার সময় ‘হঠাৎ মার্কেট’দুইদিন বন্ধ ছিল। পরে ২২ নভেম্বর আবারও ‘হঠাৎ মার্কেট’র দোকানদাররা তাদের দোকান বসায়। এ বিষয়ে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের কাছে রেল স্টেশন সীমানার মধ্যে এবং লাইনের উপর অবৈধ দোকান উচ্ছেদের জন্য ২৩ নভেম্বর চিঠি দেয়া হয়।

স্টেশন মাষ্টার আরও জানান, রেল লাইন থেকে দুই পাশের ১০ ফুট করে জায়গা ১৪৪ ধারা সবসময়ের জন্য জারী থাকরেও এসব কেউ মানছেনা। স্টেশন মাষ্টার অভিযোগ করে বলেন, সিগন্যাল এবং পয়েন্টের তারের উপর অবৈধ দোকান বসার কারনে অনেক সময় সঠিকভাবে সিগন্যাল ও পয়েন্ট করা সম্ভব হয়না। অথচ, ট্রেনের আসা যাওয়ার মূল বিষয়টি হলো সিগন্যাল এবং পয়েন্ট।

বগুড়া রেল স্টেশনের প্রধান বুকিং সহকারী শাহীন আলম জানান, রেল লাইনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী ইন্সপেক্টর রায়হান কবীরের কারণেই রেল লাইনের উপর অবৈধ হঠাৎ মার্কেট গড়ে উঠেছে। লাইনের উপর নিরাপত্তার দায়িত্ব তার থাকলেও প্রতিদিন লাইনের উপর মার্কেট দেখার পরেও উনি কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে দোকানদারদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছেন।

তবে রায়হান কবীর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাকে প্রশ্ন করা হয়, লাইনের নিরাপত্তার দায়িত্ব আপনার থাকলেও কেন ওইসব দোকান দেখেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তিনি জানান, বিষয়গুলো উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ জানেন।

বগুড়া জিআরপি ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত ইন্সপেক্টর কায়কোবাদ জানান, ঘটনাটি জানার পরে সেখানে আমরা দ্রুত যাই। কিন্তু কোনো আহত কিংবা নিহত ব্যক্তির খোঁজ পাইনি। তবে আশেপাশের লোকজন জানিয়েছেন, চার-পাঁচজন ক্রেতা আহত হয়েছেন।
বগুড়া ফায়ার স্টেশনের সিনিয়ন স্টেশন মাষ্টার বজলুর রশিদ জানান, দুইজন আহত হয়েছেন। তারা হলেন, গাবতলী উপজেলার রুমি খাতুন (৩০) এবং দুপচাঁচিয়া উপজেলার মানিক (৫৫)। তাদের শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে আরও কয়েকজনের কথা শুনলেও তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।

রেল লাইনের পাশের স্থানীয় ব্যবসায়ী নাম না প্রকাশে ইচ্ছুক কয়েকজন জানান, গত ৫/৬ বছরে প্রায় ৭-৮জন ট্রেনে কেটে হঠাৎ মার্কেটে মারা গেছে। এদের মধ্যে ক্রেতা এবং দোকানদারও ছিল। বুধবার যদি ট্রেনের চালক দ্রুত ব্রেক না করতো তাহলে কয়েক’শ লোকের প্রাণহানি ঘটতো।

কয়েক’শ মানুষ প্রাণে বেঁচে গেছে ট্রেন চালকের দক্ষতায়