দূর্ণীতিতে জর্জরিত কুষ্টিয়া ঝাউদিয়া কলেজ চলছে স্বামী-স্ত্রী ও শ্যালক দিয়ে

কে এম শাহীন রেজা কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি।।
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২২
  • ১১২ বার পঠিত

 

কুষ্টিয়ার ইবি থানাধীন (বর্তমানে ঝাউদিয়া থানা) ঝাউদিয়া কলেজের পরিচালনা পর্ষদের বেশ কয়েকবার সভাপতি ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারন সম্পাদক প্রকৌশলী ফারুক উজ জামান। আর অধ্যক্ষ হিসেবে আছেন তাঁরই স্ত্রী যিনি জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরজাহান শারমিন। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ঝাউদিয়া কলেজের শীর্ষ দুই পদ দীর্ঘদিন এই স্বামী-স্ত্রীর দখলে থাকার কারণে তাঁরা ইচ্ছামতো প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ আহ্বায়ক কমিটির সভাপতি ছিলেন প্রকৌশলী ফারুকের শ্যালক। সেই কমিটিরও মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এর পরও নতুন কমিটি বা নির্বাচন দেওয়া হচ্ছে না। সাবেক এই সভাপতি ও বর্তমান অধ্যক্ষের অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ স্থানীয় লোকজন। একটি সূত্রে জানা গেছে, দুর্নীতিগ্রস্থ অধ্যক্ষ নুরজাহান শারমিন সম্প্রতি কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজে অধ্যক্ষ পদের জন্য আবেদন করেছেন। অন্যদিকে গত মাসে জাতীয় একটি দৈনিক একটি পত্রিকায় উক্ত কলেজের দূর্ণীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেও স্থানীয় প্রশাসন ও মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও শিক্ষা মন্ত্রনালয় এখনো কোন প্রকার ব্যবস্থা নেননি বলে জানা গেছে।
কলেজ ও অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে এক লাখ ৭০ হাজার টাকা রিজার্ভ ফান্ডে জমা দিয়ে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেছিল জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও কুষ্টিয়া-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য খোন্দকার রশিদুজ্জামান দুদু। ২০০৪ সালে এমপিওভুক্ত হয় মহাবিদ্যালয়টি। পরে মহাবিদ্যালয়ের নামে জমি কিনে সেখানে চারতলা ভবন করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর আওয়ামী লীগ নেতা প্রকৌশলী ফারুক উজ জামানকে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি করা হয়। দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০০ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনিই সভাপতি ছিলেন। এরপর ২০০৪ সালে সভাপতি হন কুষ্টিয়া-৩ আসনের তখনকার সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা সোহরাব উদ্দিন। তিনি ছিলেন ২০০৬ সাল পর্যন্ত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার দায়িত্ব পান। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য রশিদুজ্জামান দুদু সভাপতি ছিলেন। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আবারও প্রকৌশলী ফারুক উজ জামান সভাপতি হন। এর পর হাজি সেলুনুর রহমান কিছুদিন সভাপতি ছিলেন। পরে প্রকৌশলী ফারুক উজ জামানের শ্যালক জাহাঙ্গীর আলমকে আহ্বায়ক কমিটির সভাপতি করা হয়। গত ২০ অক্টোবর সেই কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও এখনো কোনো কমিটি বা নির্বাচন দিচ্ছে না কলেজ কর্তৃপক্ষ। আর ২০০৭ সালে এই মহাবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হন সভাপতি ফারুকের স্ত্রী নুরজাহান শারমিন। গত সাত মাস আগে তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্ব পান। বেশির ভাগ দিনই তিনি কলেজে অনুপস্থিত থাকেন বলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সূত্রে জানা গেছে, কলেজটিকে কুক্ষিগত করতে কয়েকবারের সভাপতি ফারুক, সভাপতির স্ত্রী অধ্যক্ষ এবং সভাপতির শ্যালক আহ্বায়ক কমিটির সভাপতি মিলে ইচ্ছামতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। গত ২২ বছরে এই কলেজের আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব নেই। কলেজে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। রাস্তা থেকে নেমে মাঠের মধ্য দিয়ে কলেজে যেতে হয়। এলাকাবাসীর সঙ্গে কলেজ সভাপতি ও অধ্যক্ষের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক হাসিবুর রহমান বলেন, কলেজের আশপাশের সম্পত্তি আমাদের। অথচ কলেজ সভাপতি থাকাকালে প্রকৌশলী ফারুক উজ জামান আমাদের জমির পানের বরজ ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ধ্বংস করে দেন। কলেজের সভাপতি ও অধ্যক্ষ শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্য করার জন্য এই পদ আঁকড়ে রেখেছেন। এর আগে তাঁরা অনিয়ম-দুর্নীতি করে কলেজে শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছেন। ভবিষ্যতেও শূন্য পদে নিয়োগ বাণিজ্য করার জন্য তাঁরা কলেজ আঁকড়ে ধরে রয়েছেন। এসব কাজ বাধাহীনভাবে করার জন্য অধ্যক্ষ তাঁর স্বামী, ভাইসহ আত্মীয়স্বজনকে ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসিয়ে রেখেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা লুৎফুজ্জামান বলেন, কলেজের সভাপতি প্রকৌশলী ফারুক উজ জামান ও তাঁর স্ত্রী অধ্যক্ষ নুরজাহান শারমিন কলেজে চাকরি দেবেন বলে আমাদের জমি কলেজের নামে দানপত্র রেজিস্ট্রেশন করে নিয়েছিলেন। কিন্তু আজও আমার চাকরি হয়নি। অথচ টাকার বিনিময়ে এখানে অনেকেই চাকরি পেয়েছেন। মনিরুজ্জামান ময়না বলেন, কলেজের শিক্ষক প্রতিনিধি ঠিকমতো করা হয় না। আবার কমিটির কোনো মিটিং হয় না দীর্ঘদিন। কখন পরিচালনা পর্ষদ করা হয় বা কে হয় তা আমরা কোনোভাবে জানতে পারি না। কলেজের পিওন জাফর আলী বলেন, কলেজের আশপাশের লোকজনকে চাকরি দেওয়ার শর্তে জমি নিয়েছিল। কিন্তু আজও তাদের চাকরি দেয়নি। কলেজের পাশের বাড়ির একজনকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে জমি নিলেও পরে চাকরি দেওয়া হয়নি। মূল কমিটি করতে বোর্ড নির্দেশ দিলেও অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে নিজেদের পারিবারিক লোকজন দিয়ে এখনো কলেজ পরিচালনা করা হচ্ছে। আমরা কলেজে নির্বাচিত কমিটি চাই।
কলেজের সিনিয়র শিক্ষক সনজয় সাহা, আমিরুল ইসলাম ও জাহিদুল হক জানান, ২২ বছর বয়সের কলেজটির ১১ বছরই সভাপতি ছিলেন প্রকৌশলী ফারুক উজ জামান। নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এ বছর তাঁর শ্যালক জাহাঙ্গীর আলমকে সভাপতি করেছেন। তাঁরও মেয়াদ শেষ, কিন্তু অধ্যক্ষ এবং সাবেক সভাপতি অধ্যক্ষের স্বামী ফারুক সাহেব নির্বাচন দিতে চাচ্ছেন না। কলেজের প্রভাষক মনিব আলী বলেন, অধ্যক্ষ মাসে এক দিন আসেন কি না ঠিক নেই। কলেজে নিয়মিত না আসায় কাগজপত্র স্বাক্ষরের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফাইল স্বাক্ষর করতে ঢাকায় অধ্যক্ষের কাছে ছুটতে হয়। ২৪ শতক জমি কিনে মহাবিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ করা হলেও কলেজের চারপাশে অন্যদের জমি থাকায় সীমানাপ্রাচীর করা হচ্ছে না। এসব নিয়ে আদালতে বেশ কয়েকটি মামলা চলমান রয়েছে।
কলেজের সহকারী অধ্যাপক গোলাম হোসেন খান বলেন, আমি শিক্ষক হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করাতে অধ্যক্ষের ঢাকার বাসায় নিয়ে যাই। তিনি অনুপস্থিত থাকায় ছাত্রছাত্রীরা সঠিক সময়ে প্রত্যয়নপত্র না পাওয়ায় তাদের নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের আশপাশের অনেকের জমি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার কথা বলে নেওয়া হলেও পরে তাদের চাকরি না দিয়ে সেই পদ উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হয়েছে। সহকারী অধ্যাপক জাহিদুল হাসানও প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনিয়মের কথা তুলে ধরে বলেন, কলেজের সুষ্ঠু পরিবেশ এবং শিক্ষার মান ফিরিয়ে আনতে হলে এখানে অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচন প্রয়োজন।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী দুঃখ করে বলেন, কুষ্টিয়ার পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ ছিলেন খন্দকার রশিদুজ্জামান দুদু। তিনিই একসময় ঝাউদিয়া কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অথচ একটি মহল এই কলেজ থেকে দুদু ভাইয়ের নাম ফলক মুছে দিয়ে কলেজটি নিয়ে ব্যবসা করে খাচ্ছে। মেয়াদ পূর্ণ হলেও তাঁরা কলেজের নির্বাচন দিচ্ছে না। এটা অন্যায়। তিনিও কলেজটি রক্ষার জন্য সেখানে নির্বাচিত কমিটির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
অভিযোগ প্রসঙ্গে কলেজের অধ্যক্ষ নুরজাহান শারমিন বলেন, কলেজের আশপাশের এলাকায় ও কিছু খারাপ মানুষ আছে। আমরা যেটাই করি তাদের তা পছন্দ হয় না। এ জন্য তারা আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলে বেড়াচ্ছে। এখানে কোনো স্বজনপ্রীতি করা হয়নি। তবে কলেজের প্রয়োজনেই বিভিন্ন সময় তাকে বাইরে যেতে হয় বা থাকতে হয় বলেও দাবি করেন। কলেজের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী ফারুক উজ জামান বলেন, স্থানীয়দের সঙ্গে বিভিন্ন মতাদর্শের শিক্ষকরা উল্টাপাল্টা অভিযোগ করছেন। যার কোনো সত্যতা নেই। আমরা কলেজটিকে সঠিক জায়গায় এখনো টিকিয়ে রেখেছি।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর