বাকি চেয়ারম্যান ও কাজী আরেফ হত্যার ফাঁসির আসামি রওশন ২২ বছর পর আটক

নিজস্ব প্রতিনিধি
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৯ আগস্ট, ২০২১
  • ৫৮৩ বার পঠিত

 

জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা কুষ্টিয়ার কাজী আরেফ আহম্মেদসহ ৫ জন এবং মেহেরপুরের গাংনীর কাজিপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল বাকি হত্যা মামলার ফাঁসির আসামি রওশন আলী (৫৫) আটক হয়েছে। দীর্ঘ ২২ বছর পর রাজশাহী থেকে র্যাব তাকে আটক করে।
নাম পরিচয় পাল্টে উদয় মন্ডল নামে সে দীর্ঘদিন ধরে রাজশাহীর একটি গ্রামে বসবসা করে আসছিল।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাওরান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে এ বিষয়ে ব্রিফিং করে র্যাব।
র্যাব জানায়, দীর্ঘ সময় ধরে নাম ও বেশভুষা পরিবর্তন করে সেখানে বসবাস করছিল রওশন। র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারিতে তাকে আটক করা হয়েছে।
তাকে গাংনী থানায় আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানায় গাংনী থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বজলুর রহমান।
জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা কুষ্টিয়ার কাজী আরেফ আহম্মেদসহ জাসের পাঁচ নেতা ও গাংনীর কাজিপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান পীরতলা গ্রামের আব্দুল বাকি হত্যা মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি রওশন আলী। এছাড়াও ভবানিপুর গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আমজাদ হোসেন মাস্টার এবং আলম হুজুর হত্যা মামলার আসামি রওশন আলী।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ভবানীপুর-পীরতলাসহ কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার কিছু অংশ প্রকাশ্য অস্ত্রের ঝনঝনানি ছিল। এলাকায় আধিপত্য ছিল ইস্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির (ইপিসিপি)। পরবর্তীতে ইপিসির সাথে সম্পৃক্তরা ওয়ার্কার্স পার্টির সাথে ছিল। তবে ওয়ার্কার্স পার্টিতে থাকার সময় এলাকায় তাদের সুনাম ছিল। চোর, ডাকাতসহ সমাজের জন্য ক্ষতিকর মানুষের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান ছিল তাদের। এর পরে ব্যক্তি গ্রুপে বিভক্ত হয় কয়েকজন। এর মধ্যে মতি মোল্লা ও কাজিপুর গ্রামের সাবেক নুরু মিলিটারি ছিলেন একসাথে। তারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য যুবকদের টানতে থাকে। নুরু মিলিটারির সাথে যুক্ত হয় যুবক রওশন আলী।
এদিকে কাজিপুর ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা আব্দুল বাকি। তখন মেম্বর ছিলেন নুরু মিলিটারি। চেয়ারম্যান মেম্বরের দ্বন্দ এক পর্যায়ে নুরু মিলিটারি চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। এর জের ধরে ১৯৯৯ সালের ১৩ এপ্রিল প্রকাশ্য দিবালোকে বাকি চেয়ারম্যানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের সময় রওশন মোটর সাইকেল চালাচ্ছিলেন। নুরু মিলিটারি ছিলেন পেছনে বসে। কুষ্টিয়া-মেহেপুর সড়কের তেরাইল কলেজের পাশে মোটর সাইকেলে উপরে বসেই বাকি চেয়ারম্যানকে গুলি করে হত্যা করে তারা পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় বাকির ভাই সাজ্জাদুল স্বপন বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার আসামি হিসেবে রওশন আলীকে ২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল মেহেরপুর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক ফাঁসির আদেশ দেন।
এদিকে আব্দুল বাকিকে হত্যাকাণ্ডের পর বেপরোয় হয়ে ওঠে নুরু মিলিটারি ও রওশন আলী। বাকি হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলেন আওয়ামী লীগ নেতা আমজাদ মাস্টার। বাকি হত্যাকাণ্ডের কয়েকমাস পর প্রকাশ্য দিবালোকে ভবানীপুর-পীরতলা মাঠের সড়কে গুলি করে আমাজাদ মাস্টারকে হত্যা করে তারা। হত্যা মামলাটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
এর আগে আমজাদ মাস্টার ও আব্দুল বাকির ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত ভবানীপুর গ্রামের আলম হুজুরকে বাড়ি থেকে অপহরণ করে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করেছিল রওশন ও তার বাহিনীর সদস্যরা।
আমজাদ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই এলাকায় নুরু মিলিটারি, রওশন ও তাদের লোকজন আধিপত্য বিস্তার করে। এর পরে তারা কাজী আরেফ আহম্মেদ হত্যাকাণ্ডের মিশনে অংশ নেয়।
১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে কালিদাসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে একটি সভা চলার সময় ব্রাশ ফায়ারে জাতীয় সমাজতান্দ্রিক দল- জাসদের পাঁচজন নেতা নিহত হন।
দলটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কাজী আরেফ আহমেদ ছাড়াও নিহত হন তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলা জাসদের সভাপতি লোকমান হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব আলী, স্থানীয় জাসদ নেতা ইসরায়েল হোসেন এবং শমসের মণ্ডল।
তবে এর কিছুদিন পরে কুষ্টিয়ার কুমারখালী এলাকায় সন্ত্রাসী দলের আন্তকোন্দলে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় নুরু মিলিটারি।
এদিকে ওই হত্যাকাণ্ডের পাঁচ বছর পর ২০০৪ সালের ৩০ অগাস্ট রওশন আলীসহ ১০ জনের ফাঁসি এবং ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন কুষ্টিয়া জেলা জজ। তবে ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা হলে, ২০০৮ সালের ৫ আগস্ট হাইকোর্ট নয়জনের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন, একজনকে খালাস দেন ও ১২ জনের সাজা মওকুফ করেন।
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত দুইজন এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলে ২০১১ সালের ৭ আগস্ট হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেই আদেশ দেয়া হয়। ২০১৪ সালের ১৯ নভেম্বর ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের রিভিউ আবেদনও খারিজ করে দেয়া হয়। পরে তারা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইলেও তা নাকচ করে দেয়া হয়েছে।
২০১৬ সালের ৮ জানুয়ারী রাতে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি কার্যকর হয় তি আসামির। এরা হলেন- কুষ্টিয়ার মিরপুরের রাজনগর গ্রামের হাবিবুর রহমান, কুর্শা গ্রামের আনোয়ার হোসেন ও রাশেদুল ইসলাম। আসামিদের মধ্যে কারাগারে একজনের মৃত্যু হয় আর বাকিরা পলাতক রয়েছে। এর মধ্যে রওশন আলী আটকের মধ্য দিয়ে আরও একজন আটক হলো।
এদিকে রওশন আলী আটকের খবরে স্বস্তি ফিরে এসেছে গাংনীর আব্দুল বাকি ও আমজাদ মাস্টারের পরিবারের সদস্যদের মাঝে। এই ঘাতকের দ্রুত ফাঁসির রায় কার্যকর হবে আশা প্রকাশ করেছেন তারা।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর