কুষ্টিয়া হাইওয়ে পুলিশের ইনচার্জ ইদ্রিসের চাঁদাবাজির দৌরাত্ত্বে পরিবহন সেক্টর অসহায়

কে এম শাহীন রেজা,কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি।
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৩ জুলাই, ২০২২
  • ১৯৪ বার পঠিত
  ‘আমার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির প্রমাণ দিতে পারলে আমি চাকরী ছেড়ে দিব,’ গত জুন মাসের ২০ তারিখে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে কুষ্টিয়া চৌড়হাস ভাদালিয়া হাইওয়ে থানার ওসি ইদ্রিস আলী এ কথাগুলো বলেন। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্স ঘোষণা করলেও তারপরেও থেমে নেই হাইওয়ে পুলিশের চাঁদাবাজি। এরই মাঝে ক্যামেরায় ধরা পড়ে তাদের চাঁদাবাজির দৃশ্য । চাঁদাবাজির ভিডিওটি ধারণ করা হয় কুষ্টিয়া শহরের বাইপাস রোডে। প্রায় একমাস পূর্বে কুষ্টিয়া ত্রিমোহনী থেকে একটি ট্রাক বাইপাস সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন খাজানগরের দিকে। উক্ত ট্রাকের মধ্যে হেলপার সেজে বসে পড়েন এক প্রতিবেদক।
মাঝ পথে গিয়ে দেখে কুষ্টিয়া হাইওয়ে থানার ৫ সদস্যের একটি টিম কাগজ দেখার নাম করে রাস্তার দুই পাশে চলাচলকৃত প্রতিটা ট্রাক থামিয়ে প্রকারভেদে ১০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তুলছেন। সংবাদকর্মীর ট্রাকটিও যথারীতি হাত মেরে থামিয়ে সরাসরি চাঁদা দাবি করলেন। তখন ট্রাক ড্রাইভার বললেন, এটি খাজানগরের গাড়ি তবুও উক্ত ফাঁড়ির সদস্য গাড়ির কোন কাগজ না দেখেই চাঁদা নিলেন। চাঁদা নেওয়ার সময় ভিডিও করার চিত্রটি ঐ পুলিশ সদস্যের চোখে পড়ে গেলে গাড়ি থামিয়ে উঠে এসে মোবাইল ক্যামেরাটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টাকালে গলায় আইডি কার্ড ঝুলানো দেখে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে ওসি ইদ্রিস আলী প্রতিবেদককে ফোনে অনুরোধ করে বলেন, আমি এই মুহূর্তে বাইরে আছি। আপনি বিষয়টি নিয়ে এমন কিছু করবেন না যেন আমাদের সহকর্মীদের কোন ক্ষতি হয়। বর্তমানে এখনো ঐ পুলিশ সদস্য থানাতে কর্মরত আছেন।
চাঁদাবাজির ভিডিও ধারণ করার মাস খানেক পর গত ২০ জুন দুপুরে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের ভাদালিয়া হাইওয়ে পুলিশের থানার সামনে হাইওয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও অশালীন আচরণের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ ও অবরোধ করেছিল ট্রাক, অটো, সিএনজি, মাইক্রোবাসের মালিক, ড্রাইভার ,শ্রমিক ও নেতাকর্মীরা। উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে উক্ত থানার বদলিকৃত ওসি জুলহাসের চাঁদাবাজির ভিডিও ফুটেজ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে উক্ত ভিডিও ফুটেজ ও সংবাদটি হাইওয়ে পুলিশের সদর দপ্তর সহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে প্রেরণ করার পর তিনি বদলি হন।
তিনি চলে যাওয়ার পর ২০২১ সালের ৪ নভেম্বরে উক্ত থানাতে অফিসার ইনচার্জ হিসাবে যোগদান করেন ইদ্রিস আলী। যোগদানের পর থেকেই তিনি চাঁদাবাজির মহা উৎসবে লিপ্ত হয়ে পড়েন। শুরু করেন নিত্য নতুন কৌশল। উক্ত থানার গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, বর্তমান ইনচার্জ নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করে চাঁদাবাজি করে যাচ্ছেন। তিনি এটাও বলেন, ট্রাক, মাইক্রোবাস থামিয়ে তো প্রতিদিন চাঁদা আদায় চলছেই।
সেই সাথে প্রতিমাসে মিরপুর থেকে লাটা হাম্বা, নসিমন, করিমন চলাচল বাবদ আসে ৫০ হাজার টাকা, কুমারখালী থেকে আসে ৫০ হাজার টাকা, কুষ্টিয়া শহরের সিএনজি বাবদ আসে ৫০ হাজার টাকা, ভেড়ামারা থেকে আসে ৫০ হাজার টাকা। এছাড়াও কুষ্টিয়া সদরের ভাদালিয়া, লক্ষীপুর, ঝাউদিয়া, স্বস্তিপুর, চৌড়হাস, বিত্তিপাড়া, বালিয়াপাড়া, আলামপুর, পোড়াদহ, কাঞ্চনপুর, বংশীতলা, হরিনারায়ণপুর, বটতৈল, দূর্বাচারা সহ বিভিন্ন এলাকার ব্যাটারি চালিত অটো রিক্সা, নসিমন, করিমন, আলম সাধু লাটা হাম্বা সহ বিভিন্ন অবৈধ যানবাহনের নিকট থেকে মাসিক চুক্তি করে নিয়েছে। যে সকল অবৈধ যানবাহন গুলোর সাথে চুক্তি নেই, সেগুলো ধরেই মামলা দেওয়া হয় বাকিগুলো সাংকেতিক চিহ্ন দেখে ছেড়ে দেওয়া হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, কুষ্টিয়া হাইওয়ে পুলিশের ইনচার্জ ইদ্রিসের নেতৃত্বে টিম গঠনের মাধ্যমে প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে বাইপাস সড়কে, কুষ্টিয়া রাজবাড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কে, আলামপুর ৮ মাইল ব্রিজের পাশে সহ বিভিন্ন জায়গায় টিম গঠনের মাধ্যমে চাঁদাবাজি করে যাচ্ছেন।
কথায় আছে ‘চোরের সাত দিন, গৃহস্থের একদিন’, এই একদিন ধরা খেলো অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের হাতে, তাও আবার সরাসরি চাঁদা নেওয়ার ভিডিও ফুটেজ। এ বিষয়ে অফিসার ইনচার্জ ইদ্রিসের মুঠোফোনে চাঁদাবাজি করার ভিডিও ফুটোজের কথা হলে তিনি বলেন ভিডিওটি নিয়ে আমার অফিসে আসেন। অফিসে না যাওয়ার কারণে তিনি বিভিন্ন কর্নার থেকে প্রতিবেদককে নিউজ না করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বেশ কয়েকদিন ধরে। অন্যদিকে মাদারীপুর রিজিওনাল হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেন নাই।
চাঁদাবাজির বিষয়টি নিয়ে প্রতিটা ট্রাক মালিক ড্রাইভার হেলপার অটো, নসিমন করিমন আলমসাধুর চালকসহ এলাকাবাসী সবাই অফিসার ইনচার্জ ইদ্রিস আলীর উপর ক্ষুব্ধ। তারা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, এই অফিসার ইনচার্জের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আবেদন জানান।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর

 

 

 

বগুড়ায় ট্রেন চালকের দক্ষতায় বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে দোলন চাঁপা আন্তঃনগর ট্রেন। ওই ঘটনায় দু’জন আহত হলেও কয়েক’শ মানুষ প্রাণে বেঁচে গেছেন। রেল লাইনের উপর অবৈধ দোকানগুলো ওই দুর্ঘটনার কারণ বলে জানিয়েছেন রেল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় লোকজন।

বগুড়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে মাত্র ত্রিশ গজ দূরেই এক যুগেরও বেশি সময় ধরে (বগুড়া রেলস্টেশন থেকে একনম্বর ঘুমটি পর্যন্ত ) প্রায় তিন শতাধিক অবৈধ কাপড়ের দোকান রেল লাইনের উপর রয়েছে। বগুড়ার পুরাতন কাপড়ের বড় মার্কেট এটি। পরিচিত ‘হঠাৎ মার্কেট’ হিসেবে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কয়েক হাজার ক্রেতার সমাগম ঘটে। বছরে একবার করে রেল থেকে ওইসব দোকান উচ্ছেদ করলেও দুই তিনদিন পরে আবারও দোকান আগের মতো বসে। মূল রেল লাইনের উপর তাঁবু টানিয়ে এসব দোকান বসানো হয়েছে। ট্রেন চলে আসলেই দ্রুত তাবুগুলো সরে ফেলা হয়। কয়েক বছরে প্রায় ৭-৮ জন ক্রেতা এবং বিক্রেতার প্রাণহানি ঘটেছে এই হঠাৎ মার্কেটে।

বগুড়ার রেলস্টেশনের স্টেশন মাষ্টার আবুল কাশেম জানান, দুপুর ১১টায় দোলন চাঁটা আন্তঃনগর ট্রেন বোনারপাড়া থেকে বগুড়ায় আসছিল। অপরদিকে আরেকটি আন্তঃনগর ট্রেন লালমনি এক্সপ্রেক্স ঢাকা থেকে বগুড়া স্টেশনে আসতে থাকে। সিগন্যাল এবং পয়েন্ট ঠিক করে দোলনচাঁপা ট্রেনটির জন্য দুইনম্বর লুপ লাইনে এবং লালমনি এক্সপ্রেক্সকে একনম্বর লাইনে আসার নির্দেশনা ঠিক করা হয়। দোলনচাঁপা ট্রেনটি হুইসেল দিতে দিতে দুই নম্বর লুপ লাইন দিয়ে স্টেশনে আসতে থাকে।

‘হঠাৎ মার্কেট’র দোকানদারদের জানা ছিল ওই ট্রেনটি একনম্বর লাইন দিয়ে আসবে। তাই তারা দোকানের তাবু সরাইনি। কিন্তু যখন ট্রেনটি দুইনম্বর লুপ লাইন দিয়ে হুইসেল দিতে দিতে আসতে থাকে তখন দোকানদার এবং ক্রেতারা চিৎকার করে এদিক ওদিক দৌড়ে পালাতে থাকে। ট্রেন চালক দ্রুততার সাথে ট্রেনটি ব্রেক করায় দোকানের মালামাল নষ্ট হলেও কোন প্রাণ হানি ঘটেনি। নইলে অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারতো।

তিনি আরও জানান, গত ১৯ নভেম্বর লালমনিহাট থেকে বিভাগীয় ভূ-সম্পদ কর্মকর্তাসহ উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা স্টেশনের পাশের একটি মার্কেটের প্রায় দুইশতাধিক অবৈধ স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়ার সময় ‘হঠাৎ মার্কেট’দুইদিন বন্ধ ছিল। পরে ২২ নভেম্বর আবারও ‘হঠাৎ মার্কেট’র দোকানদাররা তাদের দোকান বসায়। এ বিষয়ে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের কাছে রেল স্টেশন সীমানার মধ্যে এবং লাইনের উপর অবৈধ দোকান উচ্ছেদের জন্য ২৩ নভেম্বর চিঠি দেয়া হয়।

স্টেশন মাষ্টার আরও জানান, রেল লাইন থেকে দুই পাশের ১০ ফুট করে জায়গা ১৪৪ ধারা সবসময়ের জন্য জারী থাকরেও এসব কেউ মানছেনা। স্টেশন মাষ্টার অভিযোগ করে বলেন, সিগন্যাল এবং পয়েন্টের তারের উপর অবৈধ দোকান বসার কারনে অনেক সময় সঠিকভাবে সিগন্যাল ও পয়েন্ট করা সম্ভব হয়না। অথচ, ট্রেনের আসা যাওয়ার মূল বিষয়টি হলো সিগন্যাল এবং পয়েন্ট।

বগুড়া রেল স্টেশনের প্রধান বুকিং সহকারী শাহীন আলম জানান, রেল লাইনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী ইন্সপেক্টর রায়হান কবীরের কারণেই রেল লাইনের উপর অবৈধ হঠাৎ মার্কেট গড়ে উঠেছে। লাইনের উপর নিরাপত্তার দায়িত্ব তার থাকলেও প্রতিদিন লাইনের উপর মার্কেট দেখার পরেও উনি কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে দোকানদারদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছেন।

তবে রায়হান কবীর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাকে প্রশ্ন করা হয়, লাইনের নিরাপত্তার দায়িত্ব আপনার থাকলেও কেন ওইসব দোকান দেখেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তিনি জানান, বিষয়গুলো উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ জানেন।

বগুড়া জিআরপি ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত ইন্সপেক্টর কায়কোবাদ জানান, ঘটনাটি জানার পরে সেখানে আমরা দ্রুত যাই। কিন্তু কোনো আহত কিংবা নিহত ব্যক্তির খোঁজ পাইনি। তবে আশেপাশের লোকজন জানিয়েছেন, চার-পাঁচজন ক্রেতা আহত হয়েছেন।
বগুড়া ফায়ার স্টেশনের সিনিয়ন স্টেশন মাষ্টার বজলুর রশিদ জানান, দুইজন আহত হয়েছেন। তারা হলেন, গাবতলী উপজেলার রুমি খাতুন (৩০) এবং দুপচাঁচিয়া উপজেলার মানিক (৫৫)। তাদের শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে আরও কয়েকজনের কথা শুনলেও তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।

রেল লাইনের পাশের স্থানীয় ব্যবসায়ী নাম না প্রকাশে ইচ্ছুক কয়েকজন জানান, গত ৫/৬ বছরে প্রায় ৭-৮জন ট্রেনে কেটে হঠাৎ মার্কেটে মারা গেছে। এদের মধ্যে ক্রেতা এবং দোকানদারও ছিল। বুধবার যদি ট্রেনের চালক দ্রুত ব্রেক না করতো তাহলে কয়েক’শ লোকের প্রাণহানি ঘটতো।

কয়েক’শ মানুষ প্রাণে বেঁচে গেছে ট্রেন চালকের দক্ষতায়