কুষ্টিয়া দৌলতপুরে স্বাভাবিক মৃত্যুকে হত্যাকান্ডে প্রভাবিত করার পায়তারা

কে এম শাহিন রেজা, কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধিঃ
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২৩
  • ৩৭ বার পঠিত

 

 

 

কুষ্টিয়া দৌলতপুরের দিঘলকান্দি গ্রামে গত রবিবার(৩ ডিসেম্বর) ভোর রাতে শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তি জামাল মোল্লার (৪৫) মৃতদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনে কোন আঘাতের চিহ্ন মেলেনি। কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে করা পোস্টমর্টেম রিপোর্টেও মৃতদেহে কোন আঘাতের চিহ্ন নাই বলে উল্লখ করা হয়েছে। এদিকে শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে মারা যাওয়া জামাল মোল্লার পরিবারকে প্রভাবিত করে থানায় হত্যা মামলা দায়েরের পায়তারা করছে একটি চক্র। চক্রটি উঠে পড়ে লেগেছে জামাল মোল্লার স্বাভাবিক মৃত্যুকে হত্যাকান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে।
অভিযোগ উঠেছে, জামাল মোল্লা গত ৩ ডিসেম্বর রবিবার ভোররাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গেলেও তার গোত্রের কয়েকজন ব্যক্তি দাবি করে আসছে জামাল মোল্লাকে দেশীয় অস্ত্র ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে তাকে দেশীয় অস্ত্র বা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হলে তার শরীরের কোথাও কোন আঘাতের চিহ্ন নেই কেন?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামাল মোল্লার এক প্রতিবেশী দাবি করেছেন, ওইদিন রাত আনুমানিক ৪টার দিকে জামাল হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। জামালের মা রহিমা খাতুনের কান্নার শব্দ শুনে আশেপাশের প্রতিবেশীরা ছুটে আসলে অনেকের মতো তিনিও ছুটে আসেন। এসে দেখতে পান জামালের মা রহিমা খাতুন তার স্ত্রীসহ ভাই এবং ভাইয়ের স্ত্রী জামাল মোল্লার মাথায় পানি দিচ্ছেন। এসময় উপস্থিত সবাই হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও তারা জামালকে হাসপাতালে নেননি। প্রত্যক্ষদর্শী ওই ব্যক্তি দাবি করেন, জামালকে মারধোর করা হয়নি। বাড়িতেই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তার পরিবারের লোকজন বলেছিলেন অসুস্থ হয়ে সে মারা গেছে। এর কিছুক্ষন পর তার গোষ্ঠীর মৃত করিম মোল্লার ছেলে কালু মোল্লা এসে জামালের মা রহিমা খাতুনকে পাশে ডেকে নিয়ে যান। কালু মোল্লা জামালের মাকে কিছু একটা বলার পর সে হঠাৎ করে দাবি করতে থাকেন তার ছেলেকে মারধোর করে মেরে ফেলা হয়েছে। ওই ব্যক্তি দাবি করেন জামাল মোল্লার পরিবারের সদস্যদের আলাদা আলাদাভাবে ডেকে নিয়ে ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসবে। কারন পরিবারটি তার গোষ্টির চাপে অথবা প্রলোভনে স্বাভাবিক মৃত্যুকে হত্যাকান্ড বলতে বাধ্য হচ্ছে।
অপর এক প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেন, শারীরিকভাবে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার কারনে জামাল মোল্লা কাজকর্ম করতে পারতেন না। আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় উন্নত চিকিৎসাও করাতে পারেননি। জামাল মোল্লা বেশ কিছুদিন ধরে সুস্থভাবে হাঁটাচলাও করতে পারতেন না। গ্রামের বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সৃষ্ট গন্ডোগলের সাথেও জামালের কোন সম্পৃক্ততা ছিলো না। জামাল মোল্লার স্বাভাবিক মৃত্যুকে হত্যাকান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে গ্রামের সাধারণ মানুষের বাড়িঘর লুটপাট, ভাঙ্গচুর করতে ইস্যু তৈরীর চেষ্টা করছেন মোল্লা গোষ্টির লোকজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই গ্রামের এক ব্যক্তি দাবি করেছেন, গ্রামের সাধারণ মানুষের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙ্গচুর ও লুটপাট করতে ১০ থেকে ১২ জনের একটি চক্র গত দুইদিন ধরে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে। দৌলতপুর থানা পুলিশ ও স্থানীয় ক্যাম্পের পুলিশের শক্ত নজরদারির কারনে চক্রটি পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী আমিন ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, দিঘলকান্দি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মোল্লা গোষ্ঠি ও সর্দার গোষ্ঠির লোকজন বেশ কয়েকদিন ধরে গ্রামের সাধারণ মানুষকে হুমকী-ধামকী ও তাদের পক্ষে ভোট না দিলে দেখে নেওয়ার কথা বলে আসছিলো। ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি হবে বুঝতে পেরে সম্পূর্ন পরিকল্পিতভাবে সংঘর্ষ বাঁধিয়েছে। গত রবিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মন্ডল গোষ্ঠীর লোকজন যাতে ভোট না দিতে পারে এবং নির্বাচন না করতে পারে এই পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ নিয়ে রাজনীতি করছে। একটি স্বাভাবিক মৃত্যুকে হত্যাকান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রতি অনুরোধ জানান, প্রকাশ্যে খোঁজ খবর নেওয়ার পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি চালালে প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসবে।
দিঘলকান্দি ৩ নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতি পাঞ্জুয়ার রহমান পলান মন্ডল জানান, মৃত ব্যক্তির লাশ নিয়ে রাজনীতির মতো জঘন্য কাজ আর কিছু হতে পারে না। একটি স্বাভাবিক মৃত্যুকে হত্যাকান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি আইনশৃঙাখলা বাহিনীরি সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান আপনারা প্রকাশ্যে ও গোপনে ঘটনার তদন্ত করে মৃত ব্যক্তির সুরতাহাল প্রতিবেদন ও পোস্টমর্টেম প্রতিবেদন যাচাই বাচাই করে সিধান্ত নিন। তাহলে প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসবে।
এবিষয়ে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, স্থানীয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। জামাল মোল্লা নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের কাজ সম্পন্ন করার পর লাশ মারা ব্যক্তির পরিবারের কাছে হস্তান্তর ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে। আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা জানার চেষ্টা করছি। তদন্ত সম্পন্ন হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
উল্লেখ্য, সাধারণ দিনমজুর জামাল মোল্লার লাশ নিয়ে গ্রাম্য রাজনীতি করছে তার গোষ্টির গুটিকয়েক ব্যক্তি। তারা স্বাভাবিক মৃত্যুকে হত্যাকান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে। সুযোগ সন্ধানী চক্রটি এর আগেও মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ নিয়ে দিঘলকান্দি গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে থেকে চাঁদা আদায়সহ বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িত ছিলো বলেও অভিযোগ আছে। এসব ঘটনায় এলাকাবাসী জোটবদ্ধ হয়ে চক্রটিকে গনধোলাই দিয়ে এলাকা ছাড়া করে। এবারও স্বাভাবিক মৃত্যুকে হত্যাকান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে লুটপাট ও চাঁদাবাজির পাঁয়তারা করছে। এলাকাবাসী বলছে, একজন দিন মজুরের স্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে কোন ষড়যন্ত্র বরদাস্ত করবো না।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর