কুড়িগ্রামের সীমান্ত দিয়ে এভাবে গরু পাচার হয় ভারত থেকে, গরুর গলায় বেঁধে দেয়া হয় মাদকের পুঁটলি

নয়ন দাস,কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধিঃ
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২১
  • ২৮১ বার পঠিত

 

কুড়িগ্রামের রাজিবপুর ও রৌমারীর পাশাপাশি অন্য উপজেলাগুলো দিয়েও দেশে ঢুকছে মাদক। সরকারি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানায়, সাত উপজেলার প্রায় ৮০টি পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন আসে মাদকসহ ভারতীয় নানা পণ্যের চোরাচালান।

কুড়িগ্রামে গেল দেড় বছরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে প্রতিদিন ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও মদ কুড়িগ্রাম থেকে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, আগে সীমানাগুলোতে মাদকের কথা শোনা যেত। এখন অলিগলিতেই অবাধে এসবের বেচাকেনা হচ্ছে। হাত বাড়ালেই মাদকের নাগাল পাচ্ছে কিশোর-তরুণরা।

জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) সৈয়দা জান্নাত আরা বলেছেন, করোনাকালে জেলায় ‘কিছুটা’ বেড়েছে মাদকের বিস্তার। সেটি নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে।

সীমান্তের জেলা কুড়িগ্রামের ১৬টি নদ-নদীতে ৩১৬ কিলোমিটার পথ রয়েছে। ভারতের আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিবঙ্গ রাজ্যের সীমানা রয়েছে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে নদী এবং কাঁটাতারবিহীন সীমানা ৫০ কিলোমিটার।

এসব সীমানা পেরিয়ে প্রতিদিনই আসছে বিপুল মাদকের চালান। মাদক পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে নারী ও শিশু-কিশোরদের।

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলা হয়ে উঠেছে ইয়াবার চালানের নিরাপদ রুট। এখানে ভারতের আসাম-মেঘালয় রাজ্য থেকে আসে এসব চালান।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলোতে গড়ে উঠেছে মাদক কারবার সিন্ডিকেট চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কের মধ্যে ইয়াবার ট্রানজিট পয়েন্ট এখন রৌমারী-রাজিবপুর উপজেলা।

জেলা থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে বিচ্ছিন্ন রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলা। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না থাকার সুযোগে ভারতের প্রায় ২০টি পয়েন্ট দিয়ে উপজেলায় আসা মাদকের চালান একাধিক হাত ও যান বদল করে ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে।

রাজিবপুর ও রৌমারীর পাশাপাশি অন্য উপজেলাগুলো দিয়েও দেশে ঢুকছে মাদক। সরকারি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা যায়, সাত উপজেলার প্রায় ৮০টি পয়েন্ট এবং ভারতের ৫০টি পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন আসে মাদকসহ ভারতীয় নানা পণ্যের চোরাচালান।

কুড়িগ্রামের সব উপজেলা দিয়েই অবাধে দেশে ঢুকছে ইয়াবাসহ নানা মাদক। জেলা পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে গত বছর ও চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত হওয়া মাদক মামলার পরিসংখ্যান পেয়েছে নিউজবাংলা।

তাতে দেখা গেছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পুলিশের করা মাদক মামলা হয়েছে ৩০৫টি। এর মধ্যে মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন ৪০১ জন।

একই সময়ে র‌্যাবের পক্ষ থেকে করা ১৫টি মামলায় মাদকসহ ২৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। মাদকদ্রব্য অধিদপ্তর থেকে করা ২৩টি মামলায় মাদকসহ ২৩ জন এবং বিজিবি ও অন্যান্য সংস্থার করা ৫৩ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬১ জন।

জেলা পুলিশ সূত্র জানায়, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পুলিশের করা মাদক মামলা হয়েছে ২৩৬টি, যাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩০৭ জন।

একই সময়ে র‍্যাবের করা ১৮টি মামলায় মাদকসহ ১৯ জন, মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের ৫৬টি মামলায় ৫৬ জন এবং বিজিবি ও অন্যান্য সংস্থার করা ৫৬টি মামলায় ৬৮ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।

একাধিক মাদকসেবী ও চোরাচালান চক্রের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই দেশের মোবাইল ফোনের সিম ব্যবহার হয় সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলোতে। ফোনেই স্থান-সময় ঠিক করে মাদক পাচার করা হয়।

ইয়াবা স্কচটেপ প্যাঁচিয়ে টেনিস বলের মতো আকার দিয়ে, সিগারেটের প্যাকেটে ভরে, প্লাস্টিকের ছোট ছোট প্যাকেট করে কাঁটাতারের ওপর দিয়ে ঢিল ছুঁড়ে দেয় ভারতীয় কারবারিরা। আবার গরু পার করার সময় গরুর গলায় পলিথিনে করে ইয়াবা পাঠানো হয়।

কাঁটাতার থেকে আনতে ইয়াবা চালানে খরচ যায় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। এক-একটি গরু পার করতে রাখাল নেন দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা।

রৌমারী উপজেলার দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের সফিকুল ইসলাম জানান, সাহেবের আলগা থেকে গয়টাপাড়া পর্যন্ত সীমান্তের যোগাযোগব্যবস্থা খুবই খারাপ। কোনো খবর পেলেও প্রশাসনকে অনেক দুর্ভোগে পড়তে হয় ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে স্থানীয় মাদক ও চোরাচালান ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

রৌমারীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল ইমরান জানান, সীমান্ত এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা গেলে চোরাচালান কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

কুড়িগ্রাম সদর পৌরসভার আইনুল হক বলেন, মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে অভিভাবকরা খুব উদ্বিগ্ন। আগে শুধু সীমান্তে মাদক পাওয়া যেত। এখন হাত বাড়ালেই শহরের অলিগলিতে তা পাওয়া যাচ্ছে। এখনই মাদক নির্মূল করা না গেলে দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে তরুণ প্রজন্ম ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়বে।

কুড়িগ্রাম শহরের খলিলগঞ্জ কারিগরি মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক আব্দুল কাদের জানান, করোনা মহামারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার সুযোগে মাদকের বিস্তৃতি অনেক গুণ বেড়েছে। মাদক নির্মূলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, মাদক সেবনকারী এবং কারবারিদের কোনো দলেই আশ্রয় না দেয়া এবং শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা গেলে মাদকের ভয়াবহতা কমে আসবে।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি আহসান হাবীব নীলু বলেন, ‘একজন মাদক কারবারি সরাসরি একাই ব্যবসা করে না। এদের সঙ্গে সমাজের অনেক রাঘববোয়ালরাও জড়িত। রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে অনেকের সখ্য থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে এই কারবারের পরিধি বাড়ছে।’

সরকারের ডোপ টেস্টের আওতায় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদেরও অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।মাদকের বিস্তার বেড়েছে স্বীকার করে জেলার পুলিশ সুপার সৈয়দা জান্নাত আরা বলেন, ‘এটি দমন করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মাদক কারবারিদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।’

মাদকের বিস্তার রোধে জনগণ, জনপ্রতিনিধিসহ সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান এসপি।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর