কুড়িগ্রামে শহীদ মিনার এক পশু বিক্রেতার ভাষ্য

নয়ন দাসকুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধিঃ
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ জুলাই, ২০২১
  • ৩৫ বার পঠিত




হাটোত জায়গা নাই কিসের তোমার শহীদ মিনার’ এক পশু বিক্রেতার ভাষ্য। কুড়িগ্রামে প্রতিষ্ঠানগুলোতে পশুর হাট-বাজার বসাতে গিয়ে অবমাননা করা হচ্ছে শহীদ মিনারের বেদীগুলো। সাধারণ ক্রেতা বিক্রেতারা অবলিলায় জুতো পায়ে উঠছেন এসব বেদীতে। এছাড়াও বেদীগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে পশু উঠা নামার কাছে। কেউ কেউ বসিয়েছেন পান সিগারেটের দোকান। এমন অবমাননাকর পরিস্থিতি বেশ কয়েকটি এলাকায় ঘটলেও এসব দেখার যেন কেউ নেই।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এমনটা হওয়ার কথা নয়। এগুলো হাট-বাজার কমিটির তদারকী করা উচিৎ ছিল। আমরা সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোতে খবর দিয়েছি। পরবর্তীতে এরকম ঘটনা ঘটারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

শুক্রবার বিকেলে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর হাটে গিয়ে দেখা যায়। চরমভাবে লংঘন করা হচ্ছে শহীদ মিনারের বেদী। এই হাটে অবস্থিত ভাষা শহীদদের বেদীতে একজন বাদাম এবং অপর দুজন বসিয়েছে পান সিগারেটের দোকান। সেখানে প্রায় কুড়িজন মানুষ স্যান্ডেল পায়ে অবস্থান নিয়েছে।

এদের একজনকে অববাননার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘বাবারে জায়গা নাই, সগাইগুলা বসছে। মুইও আসি বসছং। মোর ভুল হয়া গেইছে বাবা।’

ছাগল কিনে শহীদ মিনার উপর দাঁড়িয়ে থাকা শহিদুল আলম বলেন, পরিবশেটাই এমন। আসলে এটা আমাদের ঠিক হয়নি। কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে ভাষা শহীদদের প্রতি অমর্যাদা হচ্ছে।

এ বিষয়ে অসম্মানজনকভাবে কথা বললেন গরু বিক্রি করতে আসা জব্বার মিয়া নামে একজন। তিনি উচ্চস্বরে বললেন, হাটোত জাগা নাই, কিসের তোমার শহীদ মিনার-টিনার। ওগলা দেখার হামার টাইম নাই।

অপরদিকে একই দিনে নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা থানার কেন্দ্রীয় স্বাধীনতার বিজয় স্তম্ভকে অবমাননার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার কচাকাটা থানার কেন্দ্রীয় স্বাধীনতার বিজয় স্তম্ভটির সামনের বেদীতে ট্রাকে গরু উঠানো নামানোর কাজে ব্যবহার করছে গরু ব্যবসায়ীরা। এতে বেদীর উপর গরু মানুষের উঠা নামা এবং গরুর গোবর দিয়ে বেদীসহ বিজয় স্তম্ভটি নোংরায় পরিণত হয়। বেদীটি ক্ষতিগ্রস্থ হবারও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

এখানকার শামসুল মিয়া নামে একজন ক্রেতা জানান, শত শত মানুষের সামনে প্রকাশ্যে ট্রাক লাগিয়ে, পায়ে মাড়িয়ে গরু তোলার কাজে বিজয় স্তম্ভের বেদী ব্যবহার এটা স্বাধীনতার বিজয়স্তম্ভের অবমাননা। প্রতিদিন এই হাটে শতাধিক গরু বেচা কেনা হয়ে থাকে। গরু ওঠানোর কাজে বিজয় স্তম্ভের বেদী ব্যবহার করছেন ব্যবসায়ী মোখলেসুর রহমান এবং কচাকাটা ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান।

ব্যবসায়ী মোখলেছুর রহমান জানান, তার ১২টি এবং আতাউর রহমানের তিনটি গরু ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রাকটি ভাড়া করা হয়েছে। ইটের গাথা এই স্থানটি উচু গরু তুলতে সুবিধা তাই ট্রাক এখানে লাগানো হয়েছে। এই স্থানের অর্থ আমরা বুঝতে পারি নাই।

এ বিষয়ে আতাউর রহমান বলেন, তিনি তিনটি গরু ঢাকায় তার আত্মীয়ের বাসায় পাঠাবেন বলে এই ট্রাকে দিতে এসেছেন। তিনি আসার আগেই ট্রাকটি বেদীতে লাগিয়ে গরু তোলার কাজ শুরু হয়েছে। আসলে এখানকার কেউ এই স্তম্ভের মর্ম বুঝতে পারেনি।

কচাকাটা জাতীয় দিবস উদযাপন কমিটির কোষাধ্যক্ষ মমিনুল ইসলাম জানান, বিজয় স্তম্ভের বেদী ব্যবহার করে ট্রাকে গরু উঠানো বিষয়টি হৃদয় বিদারক। সেখানে উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিরাও ছিলো। কেউ নিষেধ করার ছিলো না।

পরে সংবাদ পেয়ে আমরা কয়েকজন সেখানে গিয়ে তাদেরকে সতর্ক করে দেই এবং ট্রাকটি সরিয়ে দেই। পরে ব্যবসায়ীদের বেদীসহ পুরো চত্তর পরিস্কার করে দিতে বলি।

এ ব্যাপারে উলিপুর উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ফয়জার রহমান বলেন, শহীদ মিনারে জুতা, স্যান্ডেল পড়ে ওঠা এটা জাতিকে অপমান করা। হাট এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। দ্রæত শহীদ মিনারের মর্যাদা রক্ষায় প্রশাসনের প্রতি আহবান জানান তিনি।

বিষয়টি নিয়ে উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূরে-এ-জান্নাত রুমি বলেন, আমাকে কেউ জানায়নি। এইমাত্র শুনলাম। শহীদ মিনারের সম্মান ক্ষুন্ন করতে না পারে এজন্য আমি উদ্যোগ নেবো।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর

 

 

 

বগুড়ায় ট্রেন চালকের দক্ষতায় বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে দোলন চাঁপা আন্তঃনগর ট্রেন। ওই ঘটনায় দু’জন আহত হলেও কয়েক’শ মানুষ প্রাণে বেঁচে গেছেন। রেল লাইনের উপর অবৈধ দোকানগুলো ওই দুর্ঘটনার কারণ বলে জানিয়েছেন রেল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় লোকজন।

বগুড়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে মাত্র ত্রিশ গজ দূরেই এক যুগেরও বেশি সময় ধরে (বগুড়া রেলস্টেশন থেকে একনম্বর ঘুমটি পর্যন্ত ) প্রায় তিন শতাধিক অবৈধ কাপড়ের দোকান রেল লাইনের উপর রয়েছে। বগুড়ার পুরাতন কাপড়ের বড় মার্কেট এটি। পরিচিত ‘হঠাৎ মার্কেট’ হিসেবে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কয়েক হাজার ক্রেতার সমাগম ঘটে। বছরে একবার করে রেল থেকে ওইসব দোকান উচ্ছেদ করলেও দুই তিনদিন পরে আবারও দোকান আগের মতো বসে। মূল রেল লাইনের উপর তাঁবু টানিয়ে এসব দোকান বসানো হয়েছে। ট্রেন চলে আসলেই দ্রুত তাবুগুলো সরে ফেলা হয়। কয়েক বছরে প্রায় ৭-৮ জন ক্রেতা এবং বিক্রেতার প্রাণহানি ঘটেছে এই হঠাৎ মার্কেটে।

বগুড়ার রেলস্টেশনের স্টেশন মাষ্টার আবুল কাশেম জানান, দুপুর ১১টায় দোলন চাঁটা আন্তঃনগর ট্রেন বোনারপাড়া থেকে বগুড়ায় আসছিল। অপরদিকে আরেকটি আন্তঃনগর ট্রেন লালমনি এক্সপ্রেক্স ঢাকা থেকে বগুড়া স্টেশনে আসতে থাকে। সিগন্যাল এবং পয়েন্ট ঠিক করে দোলনচাঁপা ট্রেনটির জন্য দুইনম্বর লুপ লাইনে এবং লালমনি এক্সপ্রেক্সকে একনম্বর লাইনে আসার নির্দেশনা ঠিক করা হয়। দোলনচাঁপা ট্রেনটি হুইসেল দিতে দিতে দুই নম্বর লুপ লাইন দিয়ে স্টেশনে আসতে থাকে।

‘হঠাৎ মার্কেট’র দোকানদারদের জানা ছিল ওই ট্রেনটি একনম্বর লাইন দিয়ে আসবে। তাই তারা দোকানের তাবু সরাইনি। কিন্তু যখন ট্রেনটি দুইনম্বর লুপ লাইন দিয়ে হুইসেল দিতে দিতে আসতে থাকে তখন দোকানদার এবং ক্রেতারা চিৎকার করে এদিক ওদিক দৌড়ে পালাতে থাকে। ট্রেন চালক দ্রুততার সাথে ট্রেনটি ব্রেক করায় দোকানের মালামাল নষ্ট হলেও কোন প্রাণ হানি ঘটেনি। নইলে অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারতো।

তিনি আরও জানান, গত ১৯ নভেম্বর লালমনিহাট থেকে বিভাগীয় ভূ-সম্পদ কর্মকর্তাসহ উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা স্টেশনের পাশের একটি মার্কেটের প্রায় দুইশতাধিক অবৈধ স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়ার সময় ‘হঠাৎ মার্কেট’দুইদিন বন্ধ ছিল। পরে ২২ নভেম্বর আবারও ‘হঠাৎ মার্কেট’র দোকানদাররা তাদের দোকান বসায়। এ বিষয়ে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের কাছে রেল স্টেশন সীমানার মধ্যে এবং লাইনের উপর অবৈধ দোকান উচ্ছেদের জন্য ২৩ নভেম্বর চিঠি দেয়া হয়।

স্টেশন মাষ্টার আরও জানান, রেল লাইন থেকে দুই পাশের ১০ ফুট করে জায়গা ১৪৪ ধারা সবসময়ের জন্য জারী থাকরেও এসব কেউ মানছেনা। স্টেশন মাষ্টার অভিযোগ করে বলেন, সিগন্যাল এবং পয়েন্টের তারের উপর অবৈধ দোকান বসার কারনে অনেক সময় সঠিকভাবে সিগন্যাল ও পয়েন্ট করা সম্ভব হয়না। অথচ, ট্রেনের আসা যাওয়ার মূল বিষয়টি হলো সিগন্যাল এবং পয়েন্ট।

বগুড়া রেল স্টেশনের প্রধান বুকিং সহকারী শাহীন আলম জানান, রেল লাইনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী ইন্সপেক্টর রায়হান কবীরের কারণেই রেল লাইনের উপর অবৈধ হঠাৎ মার্কেট গড়ে উঠেছে। লাইনের উপর নিরাপত্তার দায়িত্ব তার থাকলেও প্রতিদিন লাইনের উপর মার্কেট দেখার পরেও উনি কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে দোকানদারদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছেন।

তবে রায়হান কবীর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাকে প্রশ্ন করা হয়, লাইনের নিরাপত্তার দায়িত্ব আপনার থাকলেও কেন ওইসব দোকান দেখেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তিনি জানান, বিষয়গুলো উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ জানেন।

বগুড়া জিআরপি ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত ইন্সপেক্টর কায়কোবাদ জানান, ঘটনাটি জানার পরে সেখানে আমরা দ্রুত যাই। কিন্তু কোনো আহত কিংবা নিহত ব্যক্তির খোঁজ পাইনি। তবে আশেপাশের লোকজন জানিয়েছেন, চার-পাঁচজন ক্রেতা আহত হয়েছেন।
বগুড়া ফায়ার স্টেশনের সিনিয়ন স্টেশন মাষ্টার বজলুর রশিদ জানান, দুইজন আহত হয়েছেন। তারা হলেন, গাবতলী উপজেলার রুমি খাতুন (৩০) এবং দুপচাঁচিয়া উপজেলার মানিক (৫৫)। তাদের শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে আরও কয়েকজনের কথা শুনলেও তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।

রেল লাইনের পাশের স্থানীয় ব্যবসায়ী নাম না প্রকাশে ইচ্ছুক কয়েকজন জানান, গত ৫/৬ বছরে প্রায় ৭-৮জন ট্রেনে কেটে হঠাৎ মার্কেটে মারা গেছে। এদের মধ্যে ক্রেতা এবং দোকানদারও ছিল। বুধবার যদি ট্রেনের চালক দ্রুত ব্রেক না করতো তাহলে কয়েক’শ লোকের প্রাণহানি ঘটতো।

কয়েক’শ মানুষ প্রাণে বেঁচে গেছে ট্রেন চালকের দক্ষতায়