“চট্টগ্রামের গণপরিবহনে চরম অনিয়ম-ভোগান্তি: প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন”

বিশেষ প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৬ বার পঠিত

 

 

চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রশাসনের নাকের ডগায় গণপরিবহনে নৈরাজ্য ও অরাজকতা চলছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দেখার যেন কেউ নেই। গণপরিবহনে যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা ও নির্ধারিত ভাড়া—কোনো ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবাদ করলেই বিপদের আশঙ্কা থাকায় মান-সম্মানহানির ভয়ে অনেকেই অভিযোগ বা আপত্তি জানাতে রাজি হন না। ফলে তীব্র ক্ষোভ ও ভোগান্তি সত্ত্বেও অনেক যাত্রী নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, ভুক্তভোগী সাধারণ যাত্রীরা অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য, নাম-ঠিকানা কিংবা ঘটনার প্রমাণ দিতে গেলে অনেক সময় নানা ধরনের আপত্তি ও হয়রানির আশঙ্কার কথা জানান। তাদের ভাষ্য, গণপরিবহনে যাত্রী হয়রানি বা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বাস্তব চিত্র প্রমাণের জন্য ছবি বা ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনার ছবি বা ভিডিও ধারণকে কেন্দ্র করে পরিবহন সংশ্লিষ্ট একটি অংশের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে বিষয়টি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কোনো ঘটনার বাস্তব চিত্র প্রকাশ্যে এলে সেটিকে কেন্দ্র করে অপ্রাসঙ্গিক ইস্যু তৈরি, দলবদ্ধভাবে চাপ সৃষ্টি কিংবা বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার নানা কৌশল নেওয়া হয়। ফলে সাধারণ যাত্রীরা নিজেদের নিরাপত্তা ও সম্মানের কথা বিবেচনা করে অনেক ক্ষেত্রেই ছবি-ভিডিও ধারণ বা প্রকাশ্যে অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকেন। এর প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী হিসেবে থেকে যান সাধারণ যাত্রীরাই।

নগরীতে গ্যাসচালিত গণপরিবহনে চালক ও চালকের সহকারীদের (হেলপার) স্বেচ্ছাচারিতা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং যাত্রী হয়রানি এখন চরম আকার ধারণ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি চলে এলেও দৃশ্যমান পরিবর্তন না হয়ে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি ও দুর্ভোগ দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের চিত্র দেখা যায় স্বল্প দূরত্বের রুটগুলোতে।

নগরীর অক্সিজেন থেকে ২ নম্বর গেট এবং মাঝপথে শেখশাহ থেকে ২ নম্বর গেট—এ ধরনের স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার ক্ষেত্রে যেখানে যাত্রীর কাছ থেকে ৮ টাকা নেওয়ার কথা বলে ভুক্তভোগীরা দাবি করছেন, সেখানে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ভাড়া নিয়ে সামান্য তর্ক করলেই যাত্রীদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার, অপমানজনক আচরণ এবং অশোভন মন্তব্য করার অভিযোগও রয়েছে।

শুধু তাই নয়, কোনো যাত্রী অতিরিক্ত ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে প্রতিবাদ করলে তাকে হেনস্তা করতে উল্টো মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণের অভিযোগও পাওয়া যায়। পরে ‘ভাড়া দিচ্ছে না’—এমন অপবাদ দিয়ে ওই যাত্রীকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে পরিবহনে থাকা অন্য যাত্রীদের মধ্যেও ভীতি তৈরি হয়।

ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, কোনো অনিয়মের প্রতিবাদ কিংবা ছবি-ভিডিও ধারণকে কেন্দ্র করে কখনো কখনো দলবদ্ধভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ যাত্রীরা নিজেদের নিরাপত্তা ও মান-সম্মানের কথা চিন্তা করে আর প্রতিবাদ করার সাহস পান না। ফলে একটি অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুরো পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভোগান্তিতে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক ইস্যুকে সামনে এনে পরিবহন চলাচল বন্ধ রাখার মতো পরিস্থিতিও তৈরি করা হয়। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমার পরিবর্তে আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, নারী, বয়স্ক ও নিম্নআয়ের মানুষ এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন।

একজন যাত্রী গণপরিবহনে উঠলে তার কাছ থেকে শুধু ভাড়া নেওয়াই নয়, নিরাপদ ও সম্মানজনক সেবা দেওয়াও পরিবহন ব্যবস্থার দায়িত্বের অংশ। নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধের পরও যদি কোনো যাত্রীকে অপমান, হয়রানি কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সেটি কেবল ব্যক্তিগত ভোগান্তি নয়; এটি নগর গণপরিবহন ব্যবস্থাপনার একটি বড় প্রশ্ন।

অসহায় সাধারণ মানুষ আজ এসব অনিয়মের কাছে অনেকটাই জিম্মি হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা দেওয়ার পরও অতিরিক্ত অর্থ ফেরত না দেওয়া এবং উল্টো যাত্রীর সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের অভিযোগ কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়। একটি সভ্য ও নিয়মতান্ত্রিক সমাজে গণপরিবহনে যাত্রীদের সঙ্গে এমন আচরণের অবসান হওয়া জরুরি।

চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ মহানগরে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। তাই গণপরিবহনে শৃঙ্খলা, নির্ধারিত ভাড়া ও যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার বিষয় হতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়েও চট্টগ্রামের বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত ভাড়া, যাত্রী হয়রানি এবং নির্ধারিত গন্তব্য পর্যন্ত না যাওয়ার অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর নজরদারি জরুরি। অভিযোগ রয়েছে এমন রুটগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন করে নির্ধারিত ভাড়া ও পরিবহনসংক্রান্ত বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা যেতে পারে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের প্রচলিত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

একই সঙ্গে যাত্রীদের অভিযোগ জানানোর জন্য সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। অভিযোগকারীর পরিচয় ও নিরাপত্তা যাতে অযথা ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে গুরুত্ব দিতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন নিজের ন্যায্য অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হয়রানি, অপমান কিংবা পাল্টা চাপের মুখে না পড়েন—এ নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

গণপরিবহন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র নয়; এটি নগরবাসীর গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা। তাই অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, যাত্রী হয়রানি, দুর্ব্যবহার কিংবা প্রতিবাদকারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনা

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর