লাশ কাটা ঘরে শান্তকে আটকে অর্থ আদায় করল লক্ষন

কে এম শাহীন রেজা, কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ জুলাই, ২০২১
  • ৩৩ বার পঠিত

 

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে চারবার টাকা দিয়েও ১৩ বছরের ছেলের লাশ হাসপাতালের মর্গ থেকে বের করতে পারেননি হতভাগ্য এক ভ্যানচালক বাবা। সর্বশেষ দাবি করা ১০ হাজার টাকা দিতে না পারায় সারাদিন হাসপাতালের মর্গে লাশ আটকে রাখা হয়। ছেলের লাশের অপেক্ষায় দিনভর মর্গের সামনে বসে ছিল হতদারিদ্র সেই বাবা।

হৃদয় বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে মঙ্গলবার (১৩ জুলাই) বিকেলে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে। সারাদিন বসে থেকে ছেলের লাশ না পেয়ে শেষ বিকেলে মর্গের সামনে বুকফাটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ভ্যানচালক কমল প্রমানিক।

বারবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে থাকেন, ‘আমি গরিব মানুষ, আমি টাকা কোথায় পাব। আমার এত টাকা দেওয়ার মতো কোনো সামর্থ্য নেই। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের সহযোগিতায় মোটা অংকের টাকা দাবি করেন মর্গের ডোম লক্ষণ ও হীরা লাল।’

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, দৌলতপুর উপজেলার হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের গাছিরদিয়া গ্রামের টলটলিপাড়ার হতদরিদ্র ভ্যানচালক কমল প্রমানিকের তের বছরের ছেলে শান্ত। কয়েক বছর মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছে। অভাব-অনটনের সংসারে পড়াশোনা ছেড়ে বর্তমানে কৃষি কাজ করত।

সোমবার (১২ জুলাই) সন্ধ্যায় মায়ের ওপর অভিমান করে নিজ বাড়িতে কীটনাশক পান করে শান্ত। রাত ৭টার দিকে পরিবারের লোকজন তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে রাতেই কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। হাসপাতালে নিয়ে আসলে রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক শান্তকে মৃত ঘোষণা করেন। তাৎক্ষণিক হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে লাশ মর্গে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

মঙ্গলবার (১৩ জুলাই) বিকেল চারটায় লাশ কাটা মর্গের সামনে বুকফাটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ভ্যানচালক কমল প্রমানিক। বারবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে থাকেন, ঘরের মধ্যে ডেকে নিয়ে ওরা আমার ছেলের মরদেহ দেখিয়ে বলে, বুকের অর্ধেক কাটলে ৫ হাজার, পুরো কাটলে ১০ হাজার আর কপাল কাটতে আরও ছয় হাজার টাকা দেওয়া লাগবে। তা না হলে লাশ কাটা হবে না। ওদের বারবার বলেছি আমি গরিব মানুষ, আমার এত টাকা নেই। ওরা ক্ষিপ্ত হয়ে আমার চোখের সামনে ছেলের মরদেহ গরুর চামড়া ছেলার মতো চর চর করে ছিলে ফেলে।

তিনি বলেন, পুলিশের সামনে ডোমরা যখন টাকা দাবি করেন। তখন পুলিশ বলছে, এরা কি এসব বোঝে, তুমি এইটুকু কাটবা, এইটুকু কাটবা দেখাচ্ছ, এরা তো ওই সব বোঝে না। যে যেমন লোক, তার সঙ্গে সে রকম করো। আমি পুলিশ ভাইকে বারবার অনুরোধ করে বলেছি, ভাই আমি গরিব মানুষ। আমি ভ্যান চালিয়ে খাই। আমার টাকা দেওয়ার মতো কোনো অবস্থা নাই। আমি টাকা কোথায় পাব।

উল্টো পুলিশ আমাকে বলছে, এসব কথা এখানে চলবে না। আমি বারবার বলেছি, ভাই আমার দেওয়ার মতো কোনো ক্ষমতা নেই। আমার সহযোগিতা করার মতো লোকও নেই। আমার পাশে এসে দাঁড়াবে এমন একটা লোকও আমার নেই। ওরা আমার কোনো কথাই শোনেনি। তিনি আরও বলেন, সকাল থেকে এখন চারটা বাজে, আমার ছেলেকে এখনো নিয়ে যেতে পারিনি। ওরা বলছে টাকা ছাড়া আমার ছেলেকে দেবে না। আমি এখন টাকা কোথায় পাব। দশ হাজার টাকা দিয়ে লাশ নিয়ে যেতে বলছে। আমার কাছে তো টাকা নেই। ভাইগো আমার দশ হাজার টাকা দেওয়ার কোনো পরিবেশ নেই।

ভ্যানচালক কমল প্রমানিক অভিযোগ করে বলেন, রাতে লাশ মর্গে ঢোকানোর সঙ্গে সঙ্গে লাশ পাহারা দেওয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা দাবি করে দুইজন ডোম। আমি গরিব মানুষ, আমি টাকা কোথায় পাব, একথা বলতেই আমার ওপর রেগে উঠে। পরে আমার ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা ধার করে ওদের দিয়ে রাতে বাড়ি চলে যাই। সকালে আসার সঙ্গে সঙ্গে আবার ৭০০ টাকা, পরে আরো একশ টাকা নেয়। দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকেও বিভিন্ন খরচের কথা বলে আমার কাছ থেকে এক হাজার ৫৫০ টাকা নিয়ে নেয়।

শান্তর চাচা মামুন বলেন, সংবাদ শুনে দুপুরে আমি হাসপাতালের মর্গের সামনে এসে দেখতে পাই দুই ডোম ও একজন পুলিশ সদস্য এক টেবিলে বসে সিগারেট খাচ্ছেন। পাশে শান্তর আব্বা দাঁড়িয়ে টাকা নিয়ে কথা বলছেন। এসময় আমি মোবাইলে ভিডিও করার চেষ্টা করলে তারা টের পেয়ে যায়। পরে আমাকে ভিডিও করতে দেয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের মর্গে কর্তব্যরত পুলিশ কনেস্টবল হাবিব জানান, তার সামনেই ডোমরা টাকা দাবি করেছে। আমি তাদের কোনো কিছু বলিনি। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে হাসপাতালের মর্গের ডোম লক্ষণ জানান, তাদের কাছে কোনো টাকা দাবি করা হয়নি। তারা ইচ্ছে করে লাশ ফেলে রেখেছে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এম এ মোমেন বলেন, এ ধরণের কোনো অভিযোগ আমার কাছে আসেনি। অভিযোগ আসলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর

 

 

 

বগুড়ায় ট্রেন চালকের দক্ষতায় বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে দোলন চাঁপা আন্তঃনগর ট্রেন। ওই ঘটনায় দু’জন আহত হলেও কয়েক’শ মানুষ প্রাণে বেঁচে গেছেন। রেল লাইনের উপর অবৈধ দোকানগুলো ওই দুর্ঘটনার কারণ বলে জানিয়েছেন রেল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় লোকজন।

বগুড়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে মাত্র ত্রিশ গজ দূরেই এক যুগেরও বেশি সময় ধরে (বগুড়া রেলস্টেশন থেকে একনম্বর ঘুমটি পর্যন্ত ) প্রায় তিন শতাধিক অবৈধ কাপড়ের দোকান রেল লাইনের উপর রয়েছে। বগুড়ার পুরাতন কাপড়ের বড় মার্কেট এটি। পরিচিত ‘হঠাৎ মার্কেট’ হিসেবে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কয়েক হাজার ক্রেতার সমাগম ঘটে। বছরে একবার করে রেল থেকে ওইসব দোকান উচ্ছেদ করলেও দুই তিনদিন পরে আবারও দোকান আগের মতো বসে। মূল রেল লাইনের উপর তাঁবু টানিয়ে এসব দোকান বসানো হয়েছে। ট্রেন চলে আসলেই দ্রুত তাবুগুলো সরে ফেলা হয়। কয়েক বছরে প্রায় ৭-৮ জন ক্রেতা এবং বিক্রেতার প্রাণহানি ঘটেছে এই হঠাৎ মার্কেটে।

বগুড়ার রেলস্টেশনের স্টেশন মাষ্টার আবুল কাশেম জানান, দুপুর ১১টায় দোলন চাঁটা আন্তঃনগর ট্রেন বোনারপাড়া থেকে বগুড়ায় আসছিল। অপরদিকে আরেকটি আন্তঃনগর ট্রেন লালমনি এক্সপ্রেক্স ঢাকা থেকে বগুড়া স্টেশনে আসতে থাকে। সিগন্যাল এবং পয়েন্ট ঠিক করে দোলনচাঁপা ট্রেনটির জন্য দুইনম্বর লুপ লাইনে এবং লালমনি এক্সপ্রেক্সকে একনম্বর লাইনে আসার নির্দেশনা ঠিক করা হয়। দোলনচাঁপা ট্রেনটি হুইসেল দিতে দিতে দুই নম্বর লুপ লাইন দিয়ে স্টেশনে আসতে থাকে।

‘হঠাৎ মার্কেট’র দোকানদারদের জানা ছিল ওই ট্রেনটি একনম্বর লাইন দিয়ে আসবে। তাই তারা দোকানের তাবু সরাইনি। কিন্তু যখন ট্রেনটি দুইনম্বর লুপ লাইন দিয়ে হুইসেল দিতে দিতে আসতে থাকে তখন দোকানদার এবং ক্রেতারা চিৎকার করে এদিক ওদিক দৌড়ে পালাতে থাকে। ট্রেন চালক দ্রুততার সাথে ট্রেনটি ব্রেক করায় দোকানের মালামাল নষ্ট হলেও কোন প্রাণ হানি ঘটেনি। নইলে অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারতো।

তিনি আরও জানান, গত ১৯ নভেম্বর লালমনিহাট থেকে বিভাগীয় ভূ-সম্পদ কর্মকর্তাসহ উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা স্টেশনের পাশের একটি মার্কেটের প্রায় দুইশতাধিক অবৈধ স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়ার সময় ‘হঠাৎ মার্কেট’দুইদিন বন্ধ ছিল। পরে ২২ নভেম্বর আবারও ‘হঠাৎ মার্কেট’র দোকানদাররা তাদের দোকান বসায়। এ বিষয়ে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের কাছে রেল স্টেশন সীমানার মধ্যে এবং লাইনের উপর অবৈধ দোকান উচ্ছেদের জন্য ২৩ নভেম্বর চিঠি দেয়া হয়।

স্টেশন মাষ্টার আরও জানান, রেল লাইন থেকে দুই পাশের ১০ ফুট করে জায়গা ১৪৪ ধারা সবসময়ের জন্য জারী থাকরেও এসব কেউ মানছেনা। স্টেশন মাষ্টার অভিযোগ করে বলেন, সিগন্যাল এবং পয়েন্টের তারের উপর অবৈধ দোকান বসার কারনে অনেক সময় সঠিকভাবে সিগন্যাল ও পয়েন্ট করা সম্ভব হয়না। অথচ, ট্রেনের আসা যাওয়ার মূল বিষয়টি হলো সিগন্যাল এবং পয়েন্ট।

বগুড়া রেল স্টেশনের প্রধান বুকিং সহকারী শাহীন আলম জানান, রেল লাইনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী ইন্সপেক্টর রায়হান কবীরের কারণেই রেল লাইনের উপর অবৈধ হঠাৎ মার্কেট গড়ে উঠেছে। লাইনের উপর নিরাপত্তার দায়িত্ব তার থাকলেও প্রতিদিন লাইনের উপর মার্কেট দেখার পরেও উনি কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে দোকানদারদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছেন।

তবে রায়হান কবীর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাকে প্রশ্ন করা হয়, লাইনের নিরাপত্তার দায়িত্ব আপনার থাকলেও কেন ওইসব দোকান দেখেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তিনি জানান, বিষয়গুলো উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ জানেন।

বগুড়া জিআরপি ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত ইন্সপেক্টর কায়কোবাদ জানান, ঘটনাটি জানার পরে সেখানে আমরা দ্রুত যাই। কিন্তু কোনো আহত কিংবা নিহত ব্যক্তির খোঁজ পাইনি। তবে আশেপাশের লোকজন জানিয়েছেন, চার-পাঁচজন ক্রেতা আহত হয়েছেন।
বগুড়া ফায়ার স্টেশনের সিনিয়ন স্টেশন মাষ্টার বজলুর রশিদ জানান, দুইজন আহত হয়েছেন। তারা হলেন, গাবতলী উপজেলার রুমি খাতুন (৩০) এবং দুপচাঁচিয়া উপজেলার মানিক (৫৫)। তাদের শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে আরও কয়েকজনের কথা শুনলেও তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।

রেল লাইনের পাশের স্থানীয় ব্যবসায়ী নাম না প্রকাশে ইচ্ছুক কয়েকজন জানান, গত ৫/৬ বছরে প্রায় ৭-৮জন ট্রেনে কেটে হঠাৎ মার্কেটে মারা গেছে। এদের মধ্যে ক্রেতা এবং দোকানদারও ছিল। বুধবার যদি ট্রেনের চালক দ্রুত ব্রেক না করতো তাহলে কয়েক’শ লোকের প্রাণহানি ঘটতো।

কয়েক’শ মানুষ প্রাণে বেঁচে গেছে ট্রেন চালকের দক্ষতায়