স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে সরকারি হাসপাতালের প্রতি আস্থা বাড়াতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩৩ বার পঠিত

 

 

 

সরকারি হাসপাতাল সাধারণ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ কম খরচে ও সহজলভ্য চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাস্তবতা হলো—অনেক সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা-যন্ত্রপাতি, পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে মানুষের নানা অভিযোগ রয়েছে। ফলে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি সেবাগ্রহণকারীদের প্রত্যাশিত আস্থা সব ক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে না।

স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করতে হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নগদ চিকিৎসা ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ ও ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। বিষয়টি শুধু চিকিৎসা ভাতা দেওয়া বা না দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; এর সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান, সক্ষমতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের আস্থার প্রশ্নটি সরাসরি জড়িত।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ যদি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার সঙ্গে আরও প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হন, তাহলে এসব প্রতিষ্ঠানের বাস্তব চিত্র নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসতে পারে। রোগীদের ভোগান্তি, চিকিৎসক ও জনবল সংকট, ওষুধের প্রাপ্যতা, চিকিৎসা-যন্ত্রপাতির ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে শুধু চিকিৎসা ভাতা বন্ধ করাই কোনো সমাধান নয়। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার মান নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ, পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্স নিয়োগ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সময়মতো সেবা এবং কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। সরকারি হাসপাতালে যদি প্রয়োজনীয় সেবা, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা-সুবিধা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে শুধু ভাতা পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না।

একই সঙ্গে গুরুতর রোগ, বিশেষায়িত চিকিৎসা বা সরকারি হাসপাতালে অনুপস্থিত চিকিৎসার ক্ষেত্রে যথাযথ রেফারেল ও চিকিৎসা-ব্যয়ের ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে হবে। কারণ চিকিৎসাসেবা একটি মৌলিক প্রয়োজন। কোনো সংস্কারের কারণে জটিল বা বিশেষায়িত রোগে আক্রান্ত রোগী যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়টিও নীতিমালায় স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা জরুরি।

এ অবস্থায় সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কার্যকর, জনবান্ধব ও আস্থাশীল করতে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

কার্যকর দাবিসমূহ:

১.সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নগদ চিকিৎসা ভাতা ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করে সরকারি হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

২.সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে।

৩.সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

৪.চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করতে হবে।

৫.রোগীদের হয়রানি ও দীর্ঘ অপেক্ষা কমাতে ডিজিটাল সিরিয়াল, রেফারেল ও অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।

৬.সরকারি হাসপাতালের সেবার মান যাচাইয়ের জন্য নিয়মিত স্বাধীন মান-পর্যবেক্ষণ ও জনসন্তুষ্টি জরিপ চালু করতে হবে।

৭.সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সম্ভব নয়—এমন জটিল ও বিশেষায়িত রোগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ রেফারেল ও চিকিৎসা-ব্যয় সহায়তা ব্যবস্থা রাখতে হবে।

৮.সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ নাগরিকের অভিজ্ঞতা নিয়মিত মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে।

৯.হাসপাতালের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও রোগী হয়রানির অভিযোগ দ্রুত তদন্ত ও নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

১০.সর্বোপরি, সরকারি হাসপাতালকে এমন পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ আস্থা ও মর্যাদার সঙ্গে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে পারেন।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু সুযোগ-সুবিধার কাঠামো পরিবর্তন নয়; বরং সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যেখানে একজন সাধারণ নাগরিক চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালে গিয়ে সেবা, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও আস্থা—সবকিছুই পান।

আমাদের দাবি একটাই—চিকিৎসা সুবিধার সংস্কারের পাশাপাশি সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বাস্তবে শক্তিশালী করা হোক। সরকারি হাসপাতালের সেবার মান এমনভাবে উন্নত করা হোক, যাতে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসার জন্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে অন্যত্র ছুটতে না হয় এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও সেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারেন।

জনগণের জন্য যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আস্থাও তৈরি হোক—এটাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

জনস্বার্থেঃ
মুহাম্মদ আসাদ উল্লাহ
(বি.এস-সি)
সংগঠক। শিক্ষানুরাগী। পরামর্শক। সমাজসেবক
আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

আজীবন সদস্য:
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনিট।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর