শীর্ষ চরমপন্থী থেকে আওয়ামী লীগ নেতা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থি সংগঠন জাসদ গণবাহিনী কালুর মাস্টারমাইন্ড কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ইবি থানার দুর্বাচারা গ্রামের জাহাঙ্গীর কবির লিপটনকে কুষ্টিয়ায় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আলোচিত সবুজ হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানোর পর গত ২৫ শে আগস্ট সোমবার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন কুষ্টিয়া আদালত। গত বছর ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরের আমলা পাড়ায় রাতে সবুজ (৩০) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঐ বছরের ১৭ আগস্ট কুষ্টিয়া মডেল থানায় ঐ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়। পুলিশের তদন্তে ঐ মামলায় লিপটনের সম্পৃক্ত মিললে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানোর জন্য কুষ্টিয়া আদালতে আবেদন করেন। শুনানী শেষে ১৮ আগস্ট তাকে সে মামলায় পুন: আটক দেখানোর নির্দেশ দেন। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও কুষ্টিয়া সদরের সাবেক এমপি মাহবুবউল আলম হানিফের ঘনিষ্ঠ সহযোগি ছিলেন এই লিপটন। নৌকার প্রচারণায় গিয়ে এলাকার বিভিন্ন জায়গায় ভোট না দিলে ভোটের পরে খেলা হবে বলে হুমকি দেয়, সে সব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। গত বছর বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে কুষ্টিয়ায় প্রকাশ্যে দল বল নিয়ে সে বেশ কয়েকবার ছাত্রদের উপর হামলা চালায়। পুলিশের সঙ্গে মিশে সে নিজের অবৈধ অস্ত্র দিয়ে বিক্ষোভ ঠেকাতে শহরের একাধিক জায়গায় শিক্ষার্থীদের উপর গুলি বর্ষণ করে বলে তথ্য রয়েছে।
আওয়ামী লীগের পতনের পর সে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকারের আত্মীয় পরিচয় তার সঙ্গে ঘোরাফেরা এবং এলাকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে থাকে। আওয়ামীলীগের দোসর এখন বিএনপির ঘাড়ে সহ নানা শিরোনামে এ বিষয়ে স্থানীয় ও জাতীয় পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিতা হয়। বিশাল অস্ত্র ভান্ডার, ক্যাডার বাহিনী ও দলীয় ক্ষমতার প্রভাবে লিপটনের বিরুদ্ধে কেউ কোন কথা বলার সাহস রাখেনি। এক পর্যায়ে নিজ বাড়ি থেকে গত ৬ জুন তিন সহযোগী ও ৫টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রসহ লিপটনকে আটক করে কুষ্টিয়ার সেনাবাহিনীর একটি আভিযানিক দল। সে ঘটনায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় অস্ত্র মামলায় রিমান্ড নেওয়া হয়। গত ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির কমান্ডার ও হরিণাকুণ্ডু উপজেলার আহাদনগর গ্রামের হানেফ আলী, শ্রী-রামপুর গ্রামের লিটন ও কুষ্টিয়ার পিয়ারপুরের রাইসুল ইসলামকে হত্যা করে দায় স্বীকার করে জাসদ গণবাহিনীর কালু। কালুর ঘনিষ্ঠ, সিরিজ কিলিং মিশনের মাস্টারমাইন্ড লিপটন এ হত্যাকান্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে শৈলকুপা থানা পুলিশ ঘটনা তদন্ত শেষে নিশ্চিত হয়। গত ২৫ জুন শৈলকুপা থানা পুলিশের আবেদনের ভিত্তিতে সে মামলায় ঝিনাইদহ আদালত লিপটনকে আসামী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। গত ১ জুলাই কুষ্টিয়া কারাগার থেকে লিপটনকে ঝিনাইদহ কারাগারে স্থানান্তর করা হয় এবং পুলিশের আবেদনের ভিত্তিতে গত ৭ জুলাই ঝিনাইদহ আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। ইতিপূর্বে লিপটনের উপযুক্ত শাস্তির দাবিতে গ্রেপ্তারের দিন গত ৬ জুন শহরের এনএস রোডে এবং গত ১৫ জুন কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে কুষ্টিয়ার সচেতন নাগরিক সমাজের ব্যানারে বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষ মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে। গত ১৫ জুন তারা জেলা প্রশাসকের নিকট স্মারকলিপি দেন এবং প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জন নিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার ও ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবর অনুলিপি পাঠানো হয়।
৯০ দশকে ছাত্রলীগের ক্যাডার হিসেবে কুষ্টিয়ায় নানা সমালোচনার জন্ম দেন লিপটন। দাঙ্গাবাজ হিসেবে পরিচিতি লিপটন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মুকুল-শাহীনের নেতৃত্বে গণমুক্তিফৌজে যোগ দেন ২০০০ সালে। নীতি আদর্শ বর্জিত ও সংগঠন বিরোধী নানা কাজে জড়িয়ে পড়লে তাকে ২০০৬ সালে গণমুক্তিফৌজ থেকে তাকে অব্যাহতি দেন বলে জানা যায়। এদিকে লিপটনের ভাই আলমগীর কবির বাইরন বর্তমানে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপ সচিব হিসেবে কর্মরত। ২৭তম বিসিএস উত্তীর্ণ হলে ২০০৬ সালে পুলিশী প্রতিবেদনে সমস্যা দেখা দেয়। সে সময় লিপটন র্যাব ও পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজস করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শীর্ষ চরমপন্থীদের ধরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভাইয়ের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নেয়। এর পর সিনেমার কাহিনীকে হার মানিয়ে সে একে একে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থিদের হত্যার মিশনে নামে। সে সময় থেকে প্রশাসন থেকে লিপটনকে সকল প্রকার সহযোগিতা করা হত। আওয়ামী পরিবারের সদস্য পরিচয় দিয়ে লিপটনের ভাই উপ সচিব আলগীর কবির আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়রের একান্ত সচিব এবং কুষ্টিয়া মাহবুবউল আলম হানিফের সঙ্গে সখ্যতা তৈরি করে। ২০০৯ থেকে এক টানা ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে লিপটন, এ সময়ে হাজারো অপরাধ করলেও তার নামে মামলা নেয়নি প্রশাসন। আওয়ামী লীগের শাসনামলে এলাকার অনুষ্ঠানে হানিফের পাশাপাশি বসতেন, মিছিল মিটিংএ নেতৃত্ব দিতেন। ৫ আগস্ট পতনের আগে জুলাই বিপ্লবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিরোধ করতে লিপটন অগ্রণী ভূমিকা রাখে। সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে শহরে প্রকাশে মহড়া দেয়, পুলিশের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের মিছিলে গুলি করা এবং হাত মাইক নিয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মিছিলকারীদের লাশ ফেলে দেওয়ার হুমকি দেয়, যা অনলাইনে ভাইরাল হয়।
শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলে লিপটনও কিছুদিনের জন্য গা ঢাকা দেয়। এরপর রাতারাতি ভোল পাল্টে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রকাশ্যে এসে আবারও নানা অপতৎপরতা শুরু করে। এর ফলে জুলাই বিপ্লবের শিক্ষার্থীদের হত্যা মামলায় ভয়ে কেউ তাকে আসামি করেনি। একদিকে সরকারি দল অন্যদিকে র্যাব-দুটো ক্ষমতাকেই ইচ্ছেমতো ব্যবহার করেছে লিপটন। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও বিরোধীদের দমাতে যাকে তাকে অস্ত্রসহ র্যাব দিয়ে আটক করানো, হত্য