চট্টগ্রাম নগরীর বন্দরটিলায় রহস্যজনক বিস্ফোরণ: প্রাণ গেল ঝালমুড়ি বিক্রেতার

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৫ বার পঠিত

 

দুজন হাসপাতালে, মৃত্যুর পরও কাটেনি রহস্যের জট; ভিডিও ফুটেজ, আলামত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠছে নানা প্রশ্ন

চট্টগ্রাম নগরের ইপিজেড থানাধীন আলীশানগর বন্দরটিলা কাঁচাবাজারের পেছনে অবস্থিত ছয়তলা ‘মির্জা ম্যানসন’ ভবনের নিচতলায় ঘটে যাওয়া রহস্যজনক বিস্ফোরণের কয়েকদিন পরও কাটেনি রহস্যের জট। বিস্ফোরণে গুরুতর দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ঝালমুড়ি বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন (৪৫)। এ ঘটনায় মো. খোকন মিয়াসহ আরও একজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তির নাম-পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গত ৭ জুলাই দুপুরে ঘটে যাওয়া এ বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিস্ফোরণের উৎস কোথায় ছিল, জলাবদ্ধ নিচতলার কক্ষটিতে কী ধরনের কার্যক্রম চলত, সেখানে কোনো দাহ্য পদার্থ বা নিরাপত্তাজনিত ঘাটতি ছিল কি না—এমন একাধিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন এলাকাবাসী। নিহতের মৃত্যুর পরও ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটিত না হওয়ায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।

প্রতিবেদকের সংগ্রহ করা ছবি, ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা যায়। বিভিন্ন আলামত ও ঘটনার ধারাবিবরণী ঘিরে নতুন নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ঘটনার দিন টানা বর্ষণের কারণে ভবনের নিচতলায় হাঁটুর ওপরে পর্যন্ত পানি জমে ছিল। ওই পানিতে তলিয়ে থাকা একটি কক্ষ থেকেই হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। শব্দের তীব্রতায় আশপাশের ভবন কেঁপে ওঠে এবং মুহূর্তের মধ্যে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে অনেকেই সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা বৈদ্যুতিক কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করেছিলেন। পরে নিচতলায় গিয়ে বিস্ফোরণের ভয়াবহতা দেখতে পান। সেখানে বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের দোকানপাটেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা যায়।

স্থানীয়দের দাবি, বিস্ফোরণের সময় ভবনের নিচতলায় অবস্থিত একটি ওষুধের ফার্মেসির মালিক মাহিনুর বেগম দোকানের ভেতরে অবস্থান করছিলেন। সে সময় দোকানের সামনের শাটার বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল এবং চাবি ভবনের ইনচার্জ পলাশের কাছে ছিল বলে তারা জানান।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণের তীব্র অভিঘাতে ফার্মেসির পেছনের দরজা ভেঙে যায় এবং সামনের লোহার শাটার ছিটকে বিপরীতে অবস্থিত জনতা স্বর্ণালয়ের সামনে গিয়ে পড়ে। তবে বিস্ফোরণের সময় মাহিনুর বেগম শারীরিকভাবে অক্ষত ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেন, বিস্ফোরণের সময় ভবনের নিচতলায় অবস্থান করা এক নারীকে পরবর্তীতে তাদের সামনে আনা হয়নি। তবে এ দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

একই সময় পাশের হান্নান বিল্ডিংয়ের বাসিন্দা মো. খোকন মিয়াকে জমে থাকা পানির ওপর ভাসতে দেখে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করেন। পরে পানির ভেতর থেকে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ঘটনার কিছুক্ষণ পর বিস্ফোরণস্থলের নিচতলায় বসবাসকারী ঝালমুড়ি বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন দগ্ধ অবস্থায় বাইরে বেরিয়ে আসেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, তিনি ‘বাঁচান, বাঁচান’ বলে চিৎকার করছিলেন। তার দুই হাত, মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন অংশ গুরুতর দগ্ধ হয়েছিল।

গুরুতর আহত অবস্থায় আনোয়ার হোসেনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর গত ১১ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।

আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার পরিবারে। নিহতের ভাই দেলোয়ার হোসেন মুঠোফোনে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “ভাই, আমি আরেক যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছি না। একজন ভাইকে হারিয়েছি। এর মধ্যেই নানা বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছি। আমরা অসহায় মানুষ, খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।”

তিনি জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথমে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ গ্রহণের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মরদেহ হস্তান্তর করা সম্ভব নয়।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, “আমাদের জানানো হয়েছে, ১২ জুলাই ময়নাতদন্ত শেষে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মরদেহ গ্রহণ করতে পারব। আমরা চাই, এত কষ্টের মধ্যেও প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হোক। যদি কোনো অবহেলা বা গাফিলতি থেকে থাকে, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসুক।”

প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যমতে, বিস্ফোরণস্থলের আশপাশে পাশাপাশি তিনটি ফার্মেসি ছিল। বিস্ফোরণের তীব্রতায় একটি ফার্মেসির লোহার শাটার সম্পূর্ণ ছিটকে যায়। পূর্ব পাশে অবস্থিত আবির ফার্মেসির শাটার মাঝখান থেকে ফেটে যায়। ভবনের নিচতলার বিভিন্ন অংশেও ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন স্পষ্ট দেখা যায়।

প্রতিবেদকের হাতে থাকা ভিডিও ফুটেজে ক্ষতিগ্রস্ত শাটার, ভেঙে যাওয়া বিভিন্ন অংশ এবং বিস্ফোরণের পরবর্তী পরিস্থিতির দৃশ্য দেখা গেছে। ভিডিওতে ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন আলামতও দৃশ্যমান।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, ঘটনার পর ক্ষয়ক্ষতির ভিডিও ধারণ ও তথ্য সংগ্রহের সময় কিছু ব্যক্তি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের দাবি, ঘটনার প্রকৃত চিত্র সংরক্ষণে অনীহা দেখানো হয়েছিল।

স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, ভবনের ইনচার্জ হিসেবে পরিচিত মো. কিবরিয়া ও পলাশ এবং সংশ্লিষ্ট একটি ফার্মেসির মালিক ভিডিও ধারণ না করার অনুরোধ জানান। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ঘটনার বিষয়ে জানতে ভবনের ইনচার্জ হিসেবে পরিচিত পলাশের সঙ্গে প্রতিবেদকের ভিডিও সাক্ষাৎকার হয়। বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিস্ফোরণ কী কারণে হয়েছে, তা এখনো জানতে পারিনি।”

নিচতলার কক্ষটির ব্যবহার, বিস্ফোরণের উৎস, সেখানে কী ধরনের কার্যক্রম চলত এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলেও তিনি কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।

ঘটনার বিষয়ে জানতে ইপিজেড থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, নিহত আনোয়ার হোসেনের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর ঘটনাটির সব দিক গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করা হবে।

তিনি বলেন, তদন্তে প্রাপ্ত আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা করা হবে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।

এলাকাবাসীর দাবি, ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও কারিগরি তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। তাদের মতে, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আলামত, ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হলে বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে বিস্ফোরণের উৎস, ব্যবহৃত উপাদান, বৈদ্যুতিক সংযোগ, গ্যাস বা অন্য কোনো রাসায়নিক উপাদানের সংশ্লিষ্টতা এবং ঘটনাস্থলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা—সবকিছুই তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বন্দরটিলার এ বিস্ফোরণ এখন শুধু একটি দুর্ঘটনার ঘটনা নয়; এটি ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি এবং তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

বন্দরটিলার রহস্যজনক এ বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ জানতে এখন অপেক্ষা তদন্ত প্রতিবেদনের। নিহতের পরিবার, আহতরা, স্থানীয় বাসিন্দা এবং পুরো নগরবাসীর দৃষ্টি এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের দিকে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর