পতেঙ্গার কাটগড়ে ‘মনি প্রকাশ পিচ্ছি মনি’র অনৈতিক সাম্রাজ্যে পথভ্রষ্ট তরুণ সমাজ,

বিশেষ প্রতিনিধিঃ
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৩ বার পঠিত

 

 

 

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানাধীন কাটগড় এলাকার মোজ্জাফফর ভবনকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি কথিত অনৈতিক সিন্ডিকেট এখন স্থানীয় সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ও আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে প্রথম পর্বের সংবাদ প্রকাশের পর একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তথাকথিত গৃহবধূ কিংবা সাধারণ বাসিন্দার পরিচয়ের আড়ালে মনি ওরফে ‘পিচ্ছি মনি’ দীর্ঘদিন ধরে একটি বিস্তৃত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো এলাকার সামাজিক পরিবেশে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অভিযোগ শুধু পতিতাবৃত্তি কিংবা মাদক ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তির দাপটে চক্রটি এলাকায় এক ধরনের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানানো অসহায় নারীদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একই সঙ্গে এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় দৈনিক সোনালী খবর-এর প্রতিবেদককে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করার অপচেষ্টারও অভিযোগ উঠেছে। তবে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলে প্রতিবেদককে প্রাণনাশ, গুম এবং বিভিন্নভাবে হয়রানির হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে মনি, প্রকাশ, পিচ্ছি মনি ও তাদের সহযোগী বখাটে বাহিনীর বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাটগড়ের মোজ্জাফফর ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই কথিত আস্তানায় প্রতিনিয়ত অচেনা তরুণী ও বিভিন্ন বখাটে যুবকের যাতায়াত বেড়েই চলেছে। অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে মনি ওরফে পিচ্ছি মনি স্থানীয় কিছু উঠতি ও প্রভাবশালী নেতাকর্মীর নাম ব্যবহার করেন। ফলে ভয়ে অনেকেই তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না।
এলাকাবাসী ও স্থানীয় মসজিদের মুসল্লিরা একাধিকবার সামাজিক ও নৈতিকভাবে এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানালেও অভিযোগ রয়েছে, সাথি ও মনি তা আমলে না নিয়ে উল্টো প্রতিবাদকারীদের বিভিন্ন মিথ্যা মামলা এবং পুলিশি হয়রানির ভয় দেখিয়ে আসছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই চক্রটি এলাকার তরুণ সমাজকে মাদকাসক্তি ও নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে, ভবনের মালিক বাবুল মিয়া মাস শেষে মোটা অঙ্কের ভাড়া ও অগ্রিম জামানতের আশায় এসব কর্মকাণ্ড দেখেও না দেখার ভান করছেন এবং অভিযুক্ত চক্রকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অসহায় লাকির অভিযোগ: অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় নির্যাতনের শিকার
এই অভিযোগের সবচেয়ে ভয়াবহ ভুক্তভোগীদের একজন মোজ্জাফফর ভবনের তৃতীয় তলার ১১ নম্বর কক্ষের সাবেক ভাড়াটিয়া লাকি। স্বামীহারা এই নারী দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে গার্মেন্টসে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
একই ভবনে বসবাসের সুবাদে মনির সঙ্গে তার পরিচয় হলেও, তিনি দাবি করেন, প্রথমদিকে মনির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। পরে তিনি লক্ষ্য করেন, মনির কক্ষে প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন তরুণী ও অচেনা পুরুষের যাতায়াত রয়েছে।
লাকির অভিযোগ, একদিন মনি ওরফে পিচ্ছি মনি তার কক্ষে গিয়ে তাকে কথিত দেহব্যবসার সিন্ডিকেটে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেন। অল্প সময়ে বিপুল অর্থ উপার্জনের লোভও দেখানো হয়। তবে তিনি সেই প্রস্তাব স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং এর প্রতিবাদ জানান।
আর সেই প্রতিবাদই তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ায় বলে দাবি করেছেন লাকি।
অনৈতিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর থেকেই লাকির ওপর নেমে আসে একের পর এক নির্যাতন—এমনটাই অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী নিজেই। তার দাবি, মনি ও তার কথিত স্বামী সোহাগ মিলে তাকে নিয়মিত ভয়ভীতি প্রদর্শন, অশ্রাব্য গালিগালাজ, বাসা ছাড়ার হুমকি এবং প্রাণনাশের ভয় দেখাতে শুরু করেন।
ক্রমাগত মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতায় একপর্যায়ে লাকি বাধ্য হয়ে মোজ্জাফফর ভবনের বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। কিন্তু বাসা পরিবর্তনের পরও তাদের ক্ষোভ থামেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
লাকির ভাষ্য অনুযায়ী, একদিন প্রয়োজনীয় মশার কয়েল কিনতে ঘরের বাইরে বের হলে পূর্বপরিকল্পিতভাবে মনি, তার কথিত স্বামী সোহাগ, আলমগীর, রাহাতসহ কয়েকজন তার ওপর হামলা চালায়। চরপাড়া এলাকার সুমনের দোকানের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত ওই হামলায় তাকে লাঠিসোটা ও রড দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
হামলায় লাকির একটি হাত গুরুতরভাবে ভেঙে যায়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। বর্তমানে ভাঙা হাত এবং দুই অবুঝ সন্তানকে নিয়ে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী।
ঘটনার পর লাকি নিজেই পতেঙ্গা মডেল থানায় গিয়ে মনি, সোহাগ, আলমগীর ও রাহাতের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পতেঙ্গা মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহজাহানকে।
তবে ভুক্তভোগীর অভিযোগ, অভিযোগ দায়েরের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তার দাবি, অভিযুক্তরা এখনও এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে এবং বিভিন্নভাবে তাকে আবারও ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে লাকি চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা রহস্যজনক কারণে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না এবং তদন্তে গাফিলতি করছেন। ফলে তিনি ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন।
স্থানীয়দেরও অভিযোগ, এত গুরুতর অভিযোগের পরও দৃশ্যমান কোনো আইনগত পদক্ষেপ না থাকায় অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এ ঘটনায় পতেঙ্গা মডেল থানার ভূমিকা নিয়ে এলাকাজুড়ে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগীসহ স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে এবং এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।
মনি ওরফে ‘পিচ্ছি মনি’র কথিত অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ে প্রথম পর্বের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই অভিযুক্ত চক্রটি চাপে পড়ে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংবাদ প্রকাশের পরপরই চক্রটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে দৈনিক সোনালী খবর-এর প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, প্রথম পর্ব প্রকাশের পর দ্বিতীয় পর্বের সংবাদ প্রকাশ বন্ধ রাখার শর্তে প্রতিবেদককে মোটা অঙ্কের অর্থ, মাসোয়ারা এবং বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে সাংবাদিকতার নীতি ও পেশাগত দায়িত্বের প্রশ্নে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হলে অভিযুক্ত চক্রের আচরণ পাল্টে যায় বলে অভিযোগ।
প্রতিবেদক দাবি করেন, অর্থের প্রলোভনে ব্যর্থ হয়ে চক্রটি এখন সরাসরি ভয়ভীতি ও হুমকির পথ বেছে নিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন অপরিচিত মোবাইল নম্বর থেকে ফোন করে তাকে দেখে নেওয়া, পতেঙ্গা এলাকায় প্রবেশ করলে পঙ্গু করে দেওয়া, গুম করা এবং মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে একজন সাংবাদিককে এভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা শুধু সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়, বরং আইনের শাসনের প্রতিও প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, একদিকে কথিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এলাকার তরুণ সমাজকে মাদক ও নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিবাদী নারীদের নির্যাতন এবং সত্য উদ্ঘাটনে কাজ করা সাংবাদিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে পুরো এলাকায় এক ধরনের আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, এসব অভিযোগ সামনে আসার পরও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর আইনগত পদক্ষেপ না থাকায় অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।
যদিও পতেঙ্গা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানা গেছে, তবে অনুসন্ধান চলাকালে দৃশ্যমান কোনো উল্লেখযোগ্য আইনগত অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এ অবস্থায় কাটগড়সহ আশপাশের এলাকার সচেতন নাগরিকরা অবিলম্বে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, কথিত অনৈতিক আস্তানার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা এবং লাকির ওপর হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত মনি, সোহাগ, আলমগীর ও রাহাতের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে স্থানীয়রা চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পুলিশ কমিশনার এবং চট্টগ্রাম বন্দর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটিত হবে, দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং পতেঙ্গা এলাকার স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক পরিবেশ দ্রুত ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর